বুধবার, ২৪-এপ্রিল ২০১৯, ১২:০৫ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের বইমেলা : সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উৎসবের অপর নাম

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৮:২৪ অপরাহ্ন

 ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ: মেলা মিলিয়ে দেয় মানুষে মানুষে, জিনিসে জিনিসে, দেশে দেশে। মেলা আবার চিনিয়েও দেয় শিল্প সংস্কৃতি সমাজকে। তবে মেলা যেমন নানা জাতের, তার পৃষ্ঠপোষকরাও তেমনি আবার নানান প্রবণতার। বাণিজ্য মেলায় বিষয়নিষ্ঠদের এবং বই মেলায় জিজ্ঞাসুদের ভিড়। বই মেলার প্রচলন আগে ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি তা নিয়ে প্রভূত উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষণীয়। ব্যাপারটি নবাগত এবং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিদ্যোৎসাহীদের সন্ধানী দৃষ্টি আজ এর ওপর নিবদ্ধ। প্রতিবছর আমাদের দেশে একুশে ফেব্রুয়ারীর বই মেলাটি বেশ তোড়জোড় ও ঘটা করে হয়ে থাকে। এছাড়া, অন্যান্য সময়ও রাজধানী শহর ও মফস্বল শহরে বই মেলার আয়োজন হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের বইমেলা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে মুক্তধারা নিজেদের উদ্যোগে প্রথম বইমেলা চালু করে। বাংলা একাডেমী প্রাতিষ্ঠানিক বইমেলার আয়োজন করে ১৯৭৮ সাল থেকে। ১৯৮৫ সাল থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত বইমেলার নাম দেয়া হয় একুশে বইমেলা। সরকারি উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে আয়োজিত ঢাকা বইমেলা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বিশেষ ভুমিকা পালন করে। বর্তমানে ঢাকা বইমেলাকে আন্তর্জাতিক মেলার পর্যায়ে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে।
গ্রন্থ মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাণসত্তা। গ্রন্থ মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে। গ্রন্থই মানুষের অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন, শুভবুদ্ধি জাগরণের চাবিকাঠি। গ্রন্থপাঠ মানুষের এক দুর্নিবার নেশা। এই নেশাতেই মানুষ ছুটে যায় বইমেলায়। বইমেলা দেশ ও জাতির অগ্রগতির হাতিয়ার। কুপমন্ডুক অন্ধ ধারণা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই এর আবির্ভাব। বইমেলা এক মহৎ অনুভবেরই প্রেরণাস্থল। এখানে এসে মানুষ এক অনাবিল আনন্দ¯্রােতে অবগাহন করে। মুছে নেয় প্রতিদিনের সংসার মালিন্য। আহরণ করে নতুন প্রাণশক্তি। বইমেলায় শুধু বই কেনার আগ্রহই নয়, আছে মেলারও এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ।
বইমেলার প্রাঙ্গণে নানা ধরনের প্রকাশক স্টল খোলেন। এক একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকে এক এক ধরণের বইয়ের প্রতি। ফলে ক্রেতারা তাঁদের অভিরুচি অনুযায়ী স্টল নির্বাচন করে বই কিনতে পারে। এছাড়া, মেলা প্রাঙ্গণের সীমাবদ্ধ পরিসরে অসংখ্য রকম বইয়ের সমাবেশ ঘটায় ক্রেতাদের পক্ষে অল্প আয়াসে নিজ নিজ চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এছাড়া বই মেলায় মূল্যের দিক থেকে ক্রেতাদের কিছু ছাড় বা কমিশন দেয়া হয়।
বইমেলার উন্মুক্ত পরিবেশে ক্রেতাদের মধ্যে ভাব বিনিময়েরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তারা তাদের পছন্দ অপছন্দ, ভাল লাগা, মন্দ লাগা ও কেনা কাটার উপকরণ নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। উপরন্তু মেলার বর্ণাঢ্য পরিবেশ বড়দের বই কেনার আগ্রহে যেমন ইন্ধন যোগায়, ছোটদের কল্পনাকেও তেমনি উজ্জীবিত করে। তাছাড়া মেলা প্রাঙ্গণে লেখক ও প্রকাশকদের সমাবেশ ক্রেতাদের উৎসাহিত করে। বইমেলা বিখ্যাত লেখক ও প্রকাশকদের সঙ্গে ক্রেতাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়।
একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের জাতীয় জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আাদের জাতীয় মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ মেলার সঙ্গে একুশের জাতীয় চেতনা যুক্ত থাকে। বাংলা একাডেমির এই মেলা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিনত হয়েছে। এছাড়াও একটি পাঠ্যানুরাগী প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নতুন নতুন প্রকাশনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নতুন ও পুরাতন লেখকগণ নব উদ্দীপনায় ও নব চেতনায় নতুন নতুন বই রচনায় হাত দেন। কেউ উপন্যাস, গল্প, কবিতার বই লেখেন, আবার কেউ কেউ রচনা প্রকাশনা দুটো নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এ মেলাটি বাংলা একাডেমি চত্বরে ও রেসকোর্স ময়দানের অংশবিশেষে আয়োজন হয়ে থাকে। এ বই মেলার প্রাঙ্গণেও কী বিচিত্র পরিবেশ। কোথাও ইউনিফর্ম পরা বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা লাইন করে এগোচ্ছে, কোথাও আবার প্রবীণ তার অনেকদিন আগেকার কোনো প্রীতিভাজনকে খুঁজে পেয়ে আলিঙ্গনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। কোথাও বইয়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে দ্রুত হেটে চলা দোকানি কর্মচারী, কোথাও আবার কাধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে মন্থর গতি জ্ঞানান্বেষী। কোথাও চা, কফি বা শীতল পানীয় খেতে খেতে বই পাগলদের বিশ্রাম মুখ উপভোগ, কোথাও আবার সঙ্গীকে খুঁজে পাবার জন্য শ্রান্ত ক্লান্ত কোনো ব্যক্তির অন্বেষণ কর্ম। এছাড়া, বইয়ের বিভিন্ন স্টলেও নানা শ্রেণির মানুষ, কেই প্রাণপণ চেষ্টায় ঠেলাঠেলি করে কাউন্টারের দিকে এগুতে ব্যস্ত, কেউ আবার ভিড় এড়াবেন বলে স্টলের দরজায় দাড়িয়ে অন্যমনক। কেউ দেখছেন অনেক, কিনছেন সামান্যই, কেউ আবার ঝোকের মাথায় না দেখেই অনেক কিনে ফেলছেন।
গ্রন্থের মাধ্যমেই আমরা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারি। সমগ্র বিশ্বকে জানতে হলে গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। গ্রন্থপাঠের মাধ্যমেই আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য লাভ করতে পারি। মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্য সাধনার নীরব সাক্ষী বিশ্বের অজ¯্র গ্রন্থ। উন্নত ধরণের জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতার সঙ্গে রাখীবন্ধন স্থাপন করে গ্রন্থপাঠ। এটা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সেতু গড়ে তোলে। অতীতের ঐতিহ্য, নানা অসৎ চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারা নিহিত রয়েছে গ্রন্থরাজিতে। তাই বিচিত্র জাতি, দেশ ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য গ্রন্থের সাহায্য ছাড়া গত্যন্তর নেই। গ্রন্থমেলার সাথে নির্মল জ্ঞান অর্জনের ও পাঠের এক নিবিড় ও অচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। গ্রন্থমেলায় সাংস্কৃতিক ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে যা শিশুসহ সকল শ্রেণির দর্শকশ্রোতাকে নির্মল আনন্দ দিয়ে থাকে। এছাড়া গ্রন্থমেলায় প্রতিদিন বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানসহ নতুন নতুন গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনও হয়ে থাকে। যেখানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, আলোচক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এই আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানের ভা-ার উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে থাকে। বুদ্ধিদীপ্ত ও আলোকিত মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য মনকে আলোড়িত করে থাকে। এ ছাড়া লেখক, প্রকাশক ও পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র হিসেবে বই মেলা এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই সমাবেশ কেন্দ্রে তাদের খোলামেলা আলোচনায় মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠে চঞ্চল ও মুখরিত। অধিকন্তু বিভিন্ন গঠনমূলক আলোচনায় উৎকৃষ্ট বই সৃজনে সংশ্লিষ্ট সকলে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে থাকে। গ্রন্থ প্রভাব পাঠকচিত্তে একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকে। মহাকবি গ্যাটে পাঠের মাধ্যমেই আনন্দ খুঁজে পেতেন। পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম নিভৃতে বৃক্ষতলে স্বর্গ রচনার জন্য উপকরণের যে তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন, তাতে একখানি কাব্যের স্থান ছিল। তার মতে, গ্রন্থ ছাড়া স্বর্গীয় আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়। তিনি বলছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিযার কাল চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে; কিন্তুু একখানা বই অনন্তযৌবনা যদি তেমন বই হয়’।
বিগত কয়েক বছর আমাদের দেশে বই মেলার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। বাংলা একাডেমি আয়োজিত গত কয়েক বছরের বই মেলাই তার প্রমাণ। প্রতিবছরই এখানে ক্রেতা ও স্টলের সংখ্যা এবং বই ক্রয় বিক্রয়ের পরিমান বাড়ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জিজ্ঞাসু মানুষদের অভাব অভিযোগ যত বাড়বে, যতই দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা তাদের শৃঙ্খলিত করবে, ততই বই মেলার জনপ্রিয়তা বাড়বে; ততই সেখানকার উদার উন্মুক্ত পরিবেশে তারা খুজে পেতে চাইবেন মুক্তির স্বাদ। বাংলাদেশের বইমেলা লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের জন্য নিঃসন্দেহে এক মিলনমেলা। এই মিলন মেলা থেকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বন্ধন সুহৃদ হয়ে থাকে। তাদের এই সমাবেশ বিনোদন ও আনন্দেরও বটে। পুরা মাস ধরে বইমেলায় এক উৎসবের আনন্দে মন মেতে উঠে। কাজেই আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশের বইমেলা হচ্ছে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা ও উৎসবের বহু মাত্রিক ধারার এক মোহনাস্থল।

লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট