শুক্রবার, ২২-মার্চ ২০১৯, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন

আগুনের ভয়াবহতায় সব শেষ

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৮:৪৩ অপরাহ্ন

কাজী শওকত হোসেন: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া জাতীয় বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর প্রথম প্রহরের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত ১০.৩০ মিনেটে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় “ওয়াহেদ ম্যানশন”-এর ৪তলা ভবনের ২য় তলা থেকে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। থেকে থেকে প্রকম্পিত আওয়াজ উপরস্থ আগুনের বিস্তারে চারপাশের উপর-নিচে পুড়ে যাচ্ছে মালপত্র, দোকানপাট, রাস্তায় থাকা গাড়ি। ভিতরে-বাইরে পথচারী মালিক-কর্মচারী কেউ রেহায় পায়নি। ঘিঞ্জি সরুপথ- যেখানে পায়ে হেঁটে চলাই দুঃসাধ্য, রাতদিন বিরামহীন মানুষের মিছিল। রিকসা, ভ্যান অন্যান্য যানবাহন তো আছেই। আগুন দাউ দাউ করে বেড়ে যায়। মুহূর্তেই আশে-পাশের সব কিছু গ্রাস করে ফেলে। কেমিক্যালের দোকান ও গোডাউন থাকায় গ্যাস লাইন, ইলেক্ট্রিক লাইন যোগ হয়ে ভয়াবহতার সাথে এর প্রসারতা ও ব্যাপকতা বিস্তার লাভ করে। কিছু মানুষের অতি লোভ ও স্বার্থের কারণে, অদূরদশীতার কারণে কত মূল্যবান জীবন এমন মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হলো যার কোন সান্তনা খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রায় ৭০ জন মানুষের পুড়ে যাওয়া লাশ খুঁজে পাওয়া গেছে। ৯জন হাসপাতালে আছে দগ্ধ অবস্থায় আশংকাজনকভাবে। অনেকে এখনো নিখোঁজ, তার সংখ্যা বলা মুশকিল। ছেলের আবদারে বাবা বিরানী আনতে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারেনি বাসায়। দুই বান্ধবী বেড়াতে গিয়েছিল ঐ এলাকার এক বান্ধবীর বাসায়, তারা সবাই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। দুই ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে ঐ অবস্থায় কঙ্কাল হয়েছে। মাত্র একমাস আগে বিয়ে হয়েছিল মেহেদীর রং এখনো মুছে যায়নি, স্¦ামী এই ভয়াবহতার শিকারে প্রাণ হারিয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা এক নারী আগুনের লেলিহান শিখার কারণে উপর থেকে স্বামীসহ নিচে নেমে আসতে পারেনি। স্ত্রীকে নিয়ে স্বামী নিচে আসতে পারেননি। অনাগত সন্তানসহ সহমরন বেছে নিয়ে তার দায়িত্ব, কর্তব্য ও ভালোবাসার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আরো কত হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে যা কোনদিন জানা যাবে না কোন ভাবেই। কত স্বপ্ন, কত আশা-ভালোবাসার করুণ মৃত্যু হলো কে তার জবাব দিবে? 
২০১০ সালের নিমতলীর ঘটনা ছিল একই রকম। ১৪২ জন মানুষ নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখন সেই সংখ্যা আরো বাড়ল। তাজনীন ও হামীম গার্মেন্টস সহ অনেক ঘটনার স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বল করে। নিমতলীর ঘটনার পরে কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল পণ্যের ব্যবসা ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের পরেও ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতার কারণে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারের আরও কঠিন ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বাড়িওয়ালা ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা কোনো আইন ও নিয়ম পালনের তোয়াক্কা করেনা কখনই। এদের সহায়তায় প্রশাসনের কারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। এই কেমিক্যাল ব্যবসায়ী ও কারখানার মালিকরা নানা প্রকার ভেজাল পণ্য প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে। এদের আমদানি করা নি¤œ মানের পণ্য মানুষের শরীরের জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করছে। দুধ, মাছ, মাংস, সবজি, তেল প্রভৃতি প্রসাধনী খাদ্যদ্রব্যে নানারকম কেমিক্যাল মিশানোর এরাই মুল হোতা। এদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আজকাল খাদ্যে ভেজাল এক স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। কাপড়ের রং মেশানো মিষ্টি বেকারীর নানা খাবার, হোটেলের ভেজালযুক্ত খাবার, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পচা, বাসি খাবার ছাড়াও মাছ-মাংস, সবজি, ফল-মূলে বিষ মেশানো হয়। এছাড়া গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারও এক বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। প্রায়ই গাড়িতে আগুন ধরে মানুষ মারা যায়। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার মানসম্মত নয়। বিস্ফোরণ ঘটে অনেকে মৃত্যুবরণ করে যা প্রায়ই খবর পাওয়া যায়। এর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য আরো সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। নিম্নমানের ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রিতে বাজার ভরা। সেই পণ্য ব্যবহারের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর আসে। নকল মোবাইল ফোন, এসির বিস্ফোরণ ঘটে প্রায়ই। কেরানিগঞ্জের জিঞ্জিরায় এ্যাপেল, স্যামসাং এস-৮, এস-৯ প্রভৃতি সকল ধরনের কোম্পানির ফোন অর্ডারই করলে পাওয়া যায়। নকল ঔষধ খাওয়ার কারণে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অনেক নামকরা হাসপাতালে সাধারণের চিকিৎসার কোন সুযোগ নেই। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে না। রোগীর ভোগান্তির কোন শেষ থাকে না। তাদেরকে প্রায়ই প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। সরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। এক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় করে দেখা হয়। গ্রামের হাসপাতালে ডাক্তার অনুপস্থিতি এক নিয়মিত ঘটনা। সরকারি হাসপাতালের ঔষধের বিরাট অংশ কিছু অসাধু ব্যক্তি বাইরে বিক্রি করে দেয় যা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শিক্ষাখাতের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ অন্যান্য অনিয়ম রোধ করতে হবে কঠোরভাবে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। এর দায় সরকার এড়াতে পারে না। আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া দরকার। সড়ক পরিবহনে, রাস্তা নির্মাণে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনাও এখন মানুষ হত্যার উৎসবে পরিণত হয়েছে। সড়কে কোথাও কোন শৃঙ্খলা নেই। মালিক, শ্রমিক, বিআরটিএ এবং সড়ক বিভাগের ইঞ্জিনিয়াদের কর্মকান্ড-অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় মানুষ ক্ষুদ্ধ। ইয়াবা কারবারিরা কাদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা করে জনগণ সেটা বুঝে ও জানে। মানুষ এর প্রতিকার চায়। ন্যায়সঙ্গতভাবে দুর্নীতিমুক্ত থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজ করতে হবে মানুষ সেটা আশা করে। মানুষের নীতি-নৈতিকতার এতো অধঃপতন হয়েছে যার ফলে বেশী লোভ ও স্বার্থপরতার কারণে এই অরাজকতা। দেশপ্রেম ও বিবেক জাগ্রত না হলে, জবাবদিহিতার ভয় না থাকলে দায়িত্ব পালনে সচেতন ও যতœবান না থাকলে, নিজে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে লাভ হয় না। সঠিক আইন ও তার প্রয়োগ, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা হলে অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারে। আমরা কেউই জবাবাদিহিতার উর্দ্ধে নই, এ কথা মনে রাখতে হবে। সকল ধরনের অনিয়মের প্রতিরোধ করার আইন আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য শুধুমাত্র দুর্নীতির কারণে তার প্রয়োগ হয় না সবসময়। যাদের উপর দায়িত্ব তারা স্বচ্ছ হলে সমাজ পরিবর্তনে বেগ পেতে হয় না। তারা শুধু তাদের স্বার্থ দেখে, মানুষকে তারা নিদারুণভাবে অবহেলা করে। তাই সাধারণ মানুষকেই তাদের ভালোর জন্য সাহস ও অধিকার নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, ন্যায় ও সত্যের স্বার্থে সুস্থ এবং সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনে। পুরো ঢাকার শহরেই পানির স্বল্পতা আছে। আগুন লাগলে পানি টেনে তোলার ব্যবস্থা থাকা দরকার সারা ঢাকা শহরের সকল জায়গায়। আমাদের পানির মেইন লাইনের সাথে পাইপ সংযুক্ত করে এটা করা যায়। উন্নত দেশে যেভাবে এই ব্যবস্থাটি আছে। এটি সরকারের ভেবে দেখা জরুরি প্রয়োজন বলে মনে করি এবং স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে সেটি সম্ভব। (কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, [email protected]))