রবিবার, ২৪-জুন ২০১৮, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষার্থীদের গলায় ফাঁস

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

হানজালা শিহাব: পরীক্ষা মানেই প্রশ্ন ফাঁস। হোক না সে পরীক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির। তাতে কী? পরীক্ষা হবে অথচ প্রশ্ন ফাঁস হবে না- এটা কি হয়! বিষয়টি আশ্চর্যজনক হলেও দেশে এটাই যেন এখন বাস্তবতা। বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা- সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন ফাঁস এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে মেধাবীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। যে কারণে লেখা-পড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে তারা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির জন্য এখন আর বইয়ের ওপর নির্ভর না করে ফেসবুক আর মোবাইল ফোনে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের খোঁজে ব্যস্ত থাকেন। এতে লাভও হচ্ছে। পরীক্ষার আগেই পেয়ে যাচ্ছে প্রশ্ন। আবার কখনও ভুয়া প্রশ্ন পেয়ে বিভ্রান্ত হতে হচ্ছে। কিন্তু এ সবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা লেখা-পড়ার প্রতি মনোযোগ হারাচ্ছে। যা একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। আর শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে কার্যকর কোনও উদ্যোগ না নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। যা জাতিকে আরও হতাশ করছে বলে দাবি অভিভাবকদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। যা বর্তমানে দেশে মহামারি রূপ নিয়েছে। ধ্বংসাত্বক এ ব্যাধিতে আক্রান্ত কোমলমতি শিশু, পিইসি পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছুসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকরিপ্রার্থীরা। আর এ মহামারির ভাইরাস বিস্তৃতিতে ভূমিকা পালন করছেন শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনৈতিক দলের কর্মী ও পরীক্ষা সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো- প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষায় জালিয়াতির ক্ষতি জেনে শুনেই তারা এই অপরাধ কর্মকাণ্ড করছেন। যা কোনও সুস্থ-বিবেকমান মানুষ করার কথা নয়। আগে পরীক্ষায় নকলের কথা শোনা গেলেও প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার তেমন ইতিহাস ছিল না। কিন্তু ২০০৮ সালে নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর প্রশ্ন ফাঁসের বিস্তৃতি শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা এখন দেশে মহামারি রূপ নিয়েছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বক্তব্য জাতিকে আরও উদ্বিগ্ন ও হতাশ করেছে।
গত ১৬ ডিসেম্বর বরগুনায় ১ম থেকে ৪র্থ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার গণিতের প্রশ্ন ফাঁস হয়। এর একদিন পর ১৮ ডিসেম্বর নাটোর সদরেও একই ঘটনা ঘটে। বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও এসব ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বেকায়দায় ফেলতেই শিক্ষকরা প্রশ্ন ফাঁস করেছেন।’ এর আগেও প্রশ্ন ফাঁসের জন্য তিনি শিক্ষকদের দায়ী করে বলেছেন, ‘খুন করলে ফাঁসি হয়, এটা কি বন্ধ হয়ে গেছে? প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে, বিচার হচ্ছে, ফাঁসি হচ্ছে, আবার খুন হচ্ছে।’ শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শিক্ষাবিদ, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ উদাহরণ টেনে মন্ত্রী হয়তো বুঝাতে চেয়েছেন- প্রশ্ন ফাঁসও বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতন মহল মনে করেন, তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এ মহামারির পরিসমাপ্তির কোনও বিকল্প নেই।
সূত্র বলছে, প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে। প্রমাণও মিলছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। পরীক্ষা শুরুর আগেই পরীক্ষার্থীদের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ছে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষাও বাদ যাচ্ছে না। সব শেষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির বর্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাও ঘটলো। শিক্ষা জীবনের শুরুতেই কোমলমতি শিশুদের এ অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করে প্রকৃতপক্ষে জাতি হিসেবে তাদের পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। প্রশ্নফাঁস বন্ধে করণীয় নিয়ে পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে। সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, এখন প্রতিদিনই ডিজিটাল উপায়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে পরীক্ষার আগে চোখ রাখছে মোবাইলের স্ক্রিনে। তারা বলছেন, যেকোনো উপায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতেই হবে। না হলে এ জাতি জীবনেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না।
প্রশ্ন ফাঁস এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট কেন্দ্রের সহকারী কেন্দ্র সচিব জিনাত ফারহানা বলেন, আমরা শিক্ষকরাই প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী। স্কুলগুলো তাদের সুনাম ধরে রাখতে প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন তো শিক্ষকদের কাছেই আসে। তারা আগেভাগে প্রশ্ন খুলে তা ছড়িয়ে দেন। আর অভিভাবকরাও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সন্তানদের সাহায্য করছেন।
প্রশ্ন ফাঁসের কিছু খণ্ড চিত্র
সব শেষ প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়া যায় ১৭ ডিসেম্বর। ঘটনাটি নাটোরের সদর উপজেলায়। ১ম শ্রেণি থেকে ৪র্থ শ্রেণির স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার গণিতের প্রশ্ন ফাঁসে উপজেলার ১০২টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এদিনই এ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ১৬ ডিসেম্বর একই ঘটনা ঘটে বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানার পর ১৭ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠেয় উপজেলার ১৪০টি স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত করে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস
এর আগে, চলতি বছর জেএসসি পরীক্ষার সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রশ্নফাঁস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই প্রতিষ্ঠানে ক’জন শিক্ষক অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে প্রশ্নফাঁস করেছেন। যার কিছু চিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আনিস জামান পিপু তার মোবাইলে সেই প্রশ্নফাঁসের চিত্র তুলে ফেইসবুকে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “ইন্টার-ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং নিজ ব্যাচের খেলা চলার সুবাদে, দর্শক হিসেবে ৯ নভেম্বর সকাল ৭টায় ‘জাহাঙ্গীরনগর স্কুল ও কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে হাজির হই। খেলা সাড়ে ৮টায় গড়াতে না গড়াতেই শুরু হয় বিভিন্ন স্কুল থেকে জেএসসি পরীক্ষার্থী বহনকারী বাসের আগমন। হঠাৎ খেয়াল করলাম, একজন শিক্ষক তিনজন ছাত্রীকে বাসগুলোর পেছনে নিয়ে যান! সন্দেহ হওয়াতে ছুটে যেয়ে দেখি, তিনি তার অ্যান্ড্রয়েড ফোনটি বের করে, দেখে দেখে বলে দিচ্ছেন একের পর এক অবজেক্টিভ প্রশ্নের উত্তর! এভাবে তিনি একটু পর পর কয়েকজন করে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়ে বলতে থাকেন সবগুলো উত্তর! তিনি শুধু একাই নন, অন্য বাসগুলো থেকেও কয়েকজন শিক্ষক একই কাজ করতে থাকেন! আমি আরও অবাক হলাম, যখন দেখতে পেলাম, কিছু অভিভাবকও তাদের সন্তানদের নিয়ে একইভাবে, ফোন দেখে উত্তর মুখস্ত করাতে থাকেন! হঠাৎ দেখলাম, প্রায় সকল শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের বদলে অ্যান্ড্রয়েড ফোন! শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নেয়ার বদলে, শিক্ষার্থীরা নকল বা চিটিং করায় ব্যস্ত ছিল!”
কেবল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজেই নয়, একই চিত্র রাজধানীর অন্যান্য স্কুলগুলোতেও দেখা গেছে। চলতি বছর জেএসসি পরীক্ষায় রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের কেন্দ্রগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই একই চিত্র দেখা যায়। পরীক্ষা শুরুর আগে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। কোথাও একা, কোথাও আবার অভিভাবকদের সঙ্গে দুই-তিনজন শিশু মিলে প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেখছেন। দু-একজন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তায় সহযোগিতা করছেন। কোথা থেকে প্রশ্ন এসেছে- জানতে চাইলে শিক্ষার্থীদের উত্তর, ‘পরিচিত ভাইয়া আছে, তার কাছ থেকেই প্রশ্ন পাই।’ এ প্রশ্ন পরীক্ষায় আসবে কি না, ‘ভাইয়া শিওর হয়েই প্রশ্ন দেয়’, সহজ উত্তর শিশু শিক্ষার্থীদের। পাশেই দাঁড়ানো অভিভাবক প্রশ্ন ফাঁসের কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা কেউই তো চাই না আমার বাচ্চাটা পরীক্ষায় খারাপ করুক। সবাই তো প্রশ্ন পাচ্ছে। যা পড়ার আগেই তো পড়ছে। এখন একটু চোখ বুলিয়ে যাওয়া। এর ফলে সন্তানের ‘নৈতিক অবক্ষয়’ হচ্ছে জেনেও এক অভিভাবক বলেন, ওর বন্ধুরা পাচ্ছে, সেখান থেকে ও দেখে নিচ্ছে। তবে অনেক অভিভাবক প্রশ্ন ফাঁসের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে পরীক্ষা নেয়ার কোনও মানে হয় না। বরং পরীক্ষার নামে জীবনের শুরুর দিকেই ছেলে-মেয়েদের অনৈতিক পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যা নতুন প্রজন্মকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। এভাবে, প্রতিটি পরীক্ষার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ওই বিষয়ে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। ফেইসবুকের বিভিন্ন পেজ থেকে কোনোটায় টাকার বিনিময়ে আবার কোনোটাতে বিনামূল্যেই প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। এসব প্রশ্নের সাথে হুবহু মিলে যায় পরীক্ষায় আসা প্রশ্নপত্র। অনেকটা ঘোষণা দিয়েই এবং প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে- এসব ডিজিটাল মাধ্যমে। ‘সকল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমাহার’, পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি প্রশ্ন সাজেশন, জেএসসি কোশ্চেন পেপার ২০১৭, জেএসসি কোশ্চেন আউট ২০১৭ অল বোর্ড, অল এক্সাম কোশ্চেন রকি ভাই, জেএসসি এক্সাম কোশ্চেন ২০১৭- এরকম অসংখ্য নামে ফেসবুকে পেইজ খুলে সেগুলোতে পরীক্ষার আগের রাত থেকেই নিশ্চিত প্রশ্ন দেয়ার কথা বলা হয়। এমনকি কখন দেয়া হবে তাও উল্লেখ থাকে। প্রমাণ হিসেবে আগের পরীক্ষার প্রশ্ন কয়টার সময় দেয়া হয়েছিল তাও তুলে দেয়া হয়। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এতকিছুর পরও সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এসব না দেখে ঘুমিয়ে থাকছেন বলেই অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে। একজন অভিভাবক বলেন, ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে মোবাইল নম্বর দিয়ে টাকা পাঠিয়ে প্রশ্নের জন্য যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। এখন তো সব সিম বায়োমেট্রিক, তাহলে এরা কারা? এদের বের করা কি কঠিন? নাকি বড় রাঘববোয়ালরাই প্রশ্ন ফাঁস করছে? আরেক অভিভাবক বলেন, কয়টা প্রশ্ন কোন কেন্দ্রে যাচ্ছে সেটা হিসাব করে তৈরি হওয়ার কথা। তাহলে উপরের লোকজন জড়িত না থাকলে উত্তরে টিক চিহ্ন দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করা সম্ভব হয় কীভাবে?
পরীক্ষা মানেই প্রশ্ন ফাঁস
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় মোট ৬৩টি বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অপর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একই সময়ে ৩০টিরও বেশি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরে প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যেও দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও বাতিল করা হয়নি পরীক্ষা। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনও সাজেশন বলে বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লোক দেখানো দু-চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। ইতিপূর্বে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হতো। এখন সেরকমের নামেমাত্র পদক্ষেপও নেয়া হয় না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। এ ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সে তদন্তের ফলাফল জানা আর সম্ভব হয়নি। অপরদিকে, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তখন বলেছিলেন, ‘যার কাছে প্রশ্ন পাওয়া যাবে, তিনিই ফাঁসের জন্য অভিযুক্ত হবেন।’ অর্থাৎ ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেলেও কেউ যাতে তা না বলে।
নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস
নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন মহামারী আকার ধারণ করেছে, বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, থানা ও উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেডিকেল, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী ব্যাংকেরও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষাসহ বেশ কিছু নিয়োগ পরীক্ষা। এ ছাড়া ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে। সেই থেকে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রায় প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষায়ই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে।
চলতি বছরের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নার্স নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেংকারি কাণ্ড বেধে যায়। নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরের অধীনে ৬ অক্টোবর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। যদিও পরীক্ষার হাসনাহেনা, শিউলী, কামিনী, রজনীগন্ধা নামের চারসেট প্রশ্নপত্র আগের দিন রাত থেকে ৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে অনেকের হাতে পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি অস্বীকার করেন পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি গুজব, প্রশ্ন ফাঁসের প্রশ্নই ওঠে না।’ অবশ্য একদিন পরই ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ওই পরীক্ষা বাতিল করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘এই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সামনে থেকে কাজ করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন নেতা।’ তারা বলেন, ‘৫ অক্টোবর রাত থেকেই এসব নেতা ২০ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি করেছেন।’ ওই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ১৬ হাজার ৯০০ জন চাকরিপ্রার্থী নার্স। তাদের থেকে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল ৪ হাজার ৬০০ জন।
গত ২৪ নভেম্বর উত্তরা ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, উত্তরা ব্যাংকের সিবিএ’র এক নেতা এই ফাঁসের চক্রের সঙ্গে জড়িত। গোয়েন্দা সংস্থার একটি টিম তাদের নজরদারিতে রেখেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্রও গোয়েন্দারা জব্দ করেছেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ইতিপূর্বে একাধিক প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার মতে, যে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নেবে তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি থাকতে হবে, যাতে ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার সুযোগ না থাকে। অনেকে মনে করেন, এই পূর্ণ প্রস্তুতিতে ব্যত্যয় হওয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনও সুযোগ নেই বলে অভিমত তাদের।
ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে গড়ে উঠেছে জালিয়াতচক্র। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ চক্র প্রশ্ন ফাঁসসহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে উত্তর বলে দেয়ার কৌশল রপ্ত করে ভর্তিচ্ছুদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। ২০১৩, ২০১৪ ও চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এ চক্র প্রযুক্তির সাহায্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ার প্রমাণ মিলে। এদিকে, চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের আগেও ২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনেও নামে। ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৫২টির মধ্যে ৪১টি প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে। এছাড়া প্রতিটি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে প্রতিবছরই ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ যাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষার সময় দু-চারজন আটক হলেও চক্রের মূল হোতারা বরাবরই থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আর কর্তৃপক্ষও অজ্ঞাত কারণে এ নিয়ে তদন্তের খুব একটা আগ্রহ দেখান না। এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের বিশ^বিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ভর্তি বাণিজ্যেরও। ফলে কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের ইংরেজি অংশটি ফাঁস হয়। ওইদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এ প্রশ্নপত্রেই ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। সূত্র বলছে, ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে কয়েকজনের ই-মেইলে ভর্তি পরীক্ষার ইংরেজি অংশের ২৪টি প্রশ্ন পাঠানো হয়। পরে সকালে পরীক্ষা শুরুর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে কয়েকজনের মোবাইলে ওইসব প্রশ্নের উত্তরের একটি লিখিত কপি খুদেবার্তা হিসেবে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিয়ে রাতেই কয়েকজন গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন। পরীক্ষা শেষে ওই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের অবিকল মিল পাওয়া যায়। এ নিয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তবে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির কারণে ১৫ জনকে আটক করার কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে ছাত্রলীগের এক নেতাও রয়েছে। এর আগে, গত ১৩ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রায় ২ ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে দু’জনকে আটকও করা হয়। গত মার্চে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদভূক্ত ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সভাপতিসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও ‘এফ’ ইউনিটে ভর্তি হওয়া ১০০ শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করা হয়। যদিও বাতিল হওয়া শিক্ষার্থীদের  এক রিটের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত তাদের ভর্তি বাতিল না করতে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে, গত বছর অক্টোবরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। তবে সেবার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেয় পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন অসাধু শিক্ষক-কর্মকর্তা। একই সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ মেলে। ভর্তি পরীক্ষার ১০ মিনিট আগেই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের হাতে চলে যায় পরীক্ষার প্রশ্ন। ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিসিএস কনফিডেন্স কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তর মোবাইল ফোন ম্যাসেজের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছে পাঠানোর ঘটনা হাতেনাতে ধরা হয়। ওই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় আটক করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাইফ আহম্মেদ লিখনকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় কোচিং খোলা রাখার অপরাধে কোচিং সেন্টারের পরিচালক মফিজুর রহমান রনিকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর আগে ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালেও পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত চক্র ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। বাদ যাচ্ছে না অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অধিকাংশ ইউনিটেই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। একই অবস্থা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও।
ভুল প্রশ্নে কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের ইংরেজি ভার্সনে অসংখ্য ভুলের জন্য দায়ী কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার নাম আবদুল মান্নান। তিনি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নগুলো করে থাকে ময়মনসিংহে অবস্থিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা অ্যাকাডেমি। সেখানে নির্ধারিত প্যানেলের মাধ্যম প্রশ্নপত্রগুলো প্রণয়ন করা হয়। গত পরীক্ষায় বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ব্যাপক ভুল ছিল। সেখানে বাক্য গঠন থেকে শুরু করে শব্দেও অনেক ভুল ছিল। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। সিলেট ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের প্রশ্নপত্রে ঘটনাটি ঘটে। এই অংশের অনুবাদের দায়িত্বে ছিলেন আবদুল মান্নান। কিন্তু এ জন্য শুধু কি ওই কর্মকর্তা একাই দায়ী? একজন কর্মকার্তাকে শাস্তি দিয়েই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?- সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।
প্রশ্ন ফাঁসে শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার আসার পর থেকেই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি বেশি আলোচিত হচ্ছে। এমন কোনও পরীক্ষা বাদ যাচ্ছে না যেটাতে শুনিনি প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে শিক্ষার্থীরা পাস করলেও নিজেরাই জ্ঞান ও বিদ্যা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। এই অনৈতিক কাজের মাধ্যমে বিনা বিদ্যা-বিনা জ্ঞান অর্জনে তারা নম্বর পেয়ে যখন উচ্চ আসনে বসবে তারাও অনৈতিক কাজকে প্রশ্রয় দিবে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, যেকোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা অনৈতিক, অনাকাক্সিক্ষত ও অগ্রহণযোগ্য। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পড়াশুনা করা ছাত্ররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস ও ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে বাণিজ্য এখন দেশের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের সিংহভাগ বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। পরীক্ষাগুলোও এখন বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের সামান্যতম সত্যতা পেলেও সে পরীক্ষা বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রশ্ন ফাঁস হলে তো বিপদের কথা। এতে কিছু অসাধু লোক সুবিধা পাবে। বাকিরা তার সাথে পারবে না। যেকোনো অবস্থাতেই এটি বন্ধ হওয়া দরকার। এর ফলে সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” তিনি বলেন, “প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকলে সেটা তো অনৈতিক বিষয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের যারা এটি নিয়ন্ত্রণ করে তাদের উচিত এটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ প্রকাশিত)