বৃহস্পতিবার, ২১-জুন ২০১৮, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ‘পরিবারতন্ত্র’ আইন পাস: ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের সুযোগ আরো বাড়লো

‘পরিবারতন্ত্র’ আইন পাস: ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের সুযোগ আরো বাড়লো

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৫:১৮ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: বেসরকারি খাতের ব্যাংক উদ্যোক্তাদের অবৈধ দাবির কাছে নতিস্বীকার করলো সরকার। ব্যাংকের ৯০ শতাংশ আমানতকারীর স্বার্থ উপেক্ষা করে মাত্র ১০ শতাংশ উদ্যোক্তাকে সুবিধা দিতে সংসদে পাস হয়েছে ‘পরিবারতান্ত্রিক’ ব্যাংক আইন। ফলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের সুযোগ আরো বাড়লো। এখন পর্যন্ত বলবৎ আইনে একটি ব্যাংকের পরিচালনায় এক পরিবারের সর্বোচ্চ দু’জন থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু সে আইনও অমান্য করে পাঁচ-ছয়জন পর্যন্ত একই পরিবারের সদস্য অবৈধভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বহাল ছিলেন। যার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল শক্তি- ব্যাংক খাতকে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা হারায় সরকারি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোও। এমন পরিস্থিতিতে পুরো ব্যাংকিং খাত বর্তমানে অসচ্ছ্বতা, অস্থিরতা, অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ছিল, পরিবারতন্ত্র থেকে ব্যাংকগুলোকে মুক্ত করার। তবে সরকার বরাবরের মতো সে পরামর্শ এবার সংসদেও উপেক্ষা করলো। অবৈধ পরিবারতন্ত্র অর্থাৎ লুটপাটতন্ত্রকে বৈধতা দিতে শেষ পর্যন্ত সংসদে সংশোধিত ব্যাংক আইন পাস করা হয়েছে। ১৫ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার প্রস্তাব অপরিবর্তিত রেখে জাতীয় সংসদে নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনটি পাস হয়। সংশোধিত আইনের বিধান অনুযায়ী বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একসঙ্গে একই পরিবারে চার সদস্য থাকার সুযোগ এবং একটানা ৯ বছর পরিচালক পদে থাকার বিধান যুক্ত হয়েছে। সেই সাথে অনেক ব্যাংকে চলছে ব্যাপক রদবদল, নিয়োগ বাণিজ্য ও ব্যয় কমাতে কর্মী ছাটাই প্রক্রিয়া। যা ব্যাংকিং পেশাকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে। এ থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ নেই। বরং নতুন আইনের কারণে আরো সংকট ঘনিভূত হবে। যার বড় খেসারত সরকারকে নির্বাচনে দিতে হবে বলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন। তারা এও বলছেন, আইন সংশোধনের ফলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটকারীদের দৌরাত্ম্য আরো বাড়বে। যা দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নকে হুমকিতে ফেলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০১৭ বছরজুড়ে দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য ছিল ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডির গবেষণা বলছে, ‘২০১৭ সালে ব্যাংক খাত ছিল কেলেঙ্কারির বছর।’ একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদও। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একের পর এক ব্যাংক দখল, বিশেষ স্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে নতুন নতুন ঋণ কেলেঙ্কারি আর অনিয়ম নিয়ে বছরব্যাপী হৈচৈ হয়েছে। এর মধ্যে, বিতর্কিত শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির নায়কদের দুর্নীতি দমন কমিশনে জিজ্ঞাসাবাদ, নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের লুটপাট, আমানতকারীদের হাহাকারের পাশাপাশি তীব্র তারল্য সংকট নিয়েও তোলপাড় হয়েছে। সমালোচনার শীর্ষে ছিল ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জোর করে পরিবর্তন। আর ন্যাশনাল ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ৩ হাজার কোট টাকা ঋণ খেলাপি এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক-এমডি ছাড়াই ব্যাংকটি চালানোর মাধ্যমে দেউলিয়াত্বের পথে হাঁটাও আলোচনায় বিশেষ স্থান পেয়েছে। এছাড়া, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক জন্ম নেয়ার কয়েক বছরের মাথায় ৭ শতাধিক কোটি টাকার নজিরবিহীন ঋণ অনিয়মে পড়ে। এ সবের পেছনে প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছিল সরকার বা সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ উদ্যোক্তাদের। সব ছাপিয়ে নতুন বছরে সাবেক ব্যাংকার আর অর্থনীতিবিদদের সমালোচনার মুখে পড়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিতর্কিত সংশোধন।
ব্যাংক কোম্পানি আইন পাস
গত ১৫ জানুয়ারি রাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল, ২০১৮’ পাসের প্রস্তাব করেন। সরকারে ও বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। সর্বশেষ ধারাটি সংশোধন করা হয় ২০১৩ সালে। এবার ধারাটি ষষ্ঠবারের মতো সংশোধন হলো। এর আগে, গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর সংসদে উত্থাপনের পর বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর পর ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কমিটি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রীর সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান উপস্থিত থাকলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন না। যে কারণে আলোচনা হয়নি। কিন্তু সর্বশেষ মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতেই বিলটি অপরিবর্তিত রেখে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে সংসদীয় কমিটি।
এর আগে গত বছরের ৮ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংশোধিত আইনের খসড়া অনুমোদনের পর থেকে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করে আসছেন। যদিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পরে বিলটি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু ২১ নভেম্বর কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বিলটি পাসের সুপারিশ করে কমিটি।
কী আছে নতুন ব্যাংক আইনে?
সংশোধিত আইনে পরিচালকের মেয়াদ সংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে, এই আইন কার্যকর হওয়ার পরে কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালক পদে একাদিক্রমে নয় বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। নয় বছর পদে থাকার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনবছর অতিবাহিত না হলে তিনি পরিচালক পদে পুনঃনিযুক্তির জন্য যোগ্য হবেন না। ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ পাস হওয়ার পর থেকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ-সম্পর্কিত ধারাটি পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ এই সংশোধনীতে আরও বলা হয়েছে একই পরিবারের সর্বোচ্চ চারজন সদস্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য
আইন সংশোধনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন, বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারায় অস্পষ্টতা রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকগণ-সংক্রান্ত তিনটি ধারায় অস্পষ্টতা দূর করা না হলে ব্যাংকগুলোর গতি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা থেকে যায়। কোনো পরিবারের কেউ পৃথকভাবে ব্যবসা করলে ও নিজেই করদাতা হলে তাকে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
২০১৭ ব্যাংক লুটপাটের বছর: সিপিডি
২০১৭ সাল ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে চিহ্নিত থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পরিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বলেছেন, ব্যাংক খাতে যে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে ২০১৮ সালে সেটা দূর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখতে পারছি না। নির্বাচনী বছরে অর্থনীতি নিয়ে নানা শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি। গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে স্বাধীন পর্যালোচনা শিরোনামে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৮-২০১৯ প্রথম অন্তর্র্বতী পর্যালোচনা’ বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিপিডি। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবস্থায় আমরা দেখছি প্রভাবশালীদের সংযোগে অনিয়ম হচ্ছে এবং বলা যায় লুটপাট চলছে। শেয়ারবাজার ধসের যে প্রভাব তা থেকে আমরা এখনো সেভাবে ফেরত আসতে পারছি না। এখন আর্থিক খাতের মধ্যে এই ব্যংকিং খাত- সেখানেও চলছে বিশৃঙ্খলা।’
২০ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, যা আগের বছর শেষে ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন যোগ করলে খেলাপি ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। এ হিসাব নিয়েও প্রশ্ন আছে। তাহলে প্রকৃত বিচারে খেলাপি কত হবে- তা কেউ জানে না। এছাড়া বিপুল পরিমাণ খেলাপির কারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সাতটি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৮ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৪২১ কোটি টাকা ঘাটতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। প্রভিশন ঘাটতির পাশাপাশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে আটটি ব্যাংক। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে আট ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু টাকা উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শ্রীলংকায় যাওয়া ২ কোটি ডলার ফেরত পাওয়া যায় সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ফেরত পাওয়া গেছে মাত্র দেড় কোটি ডলার। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এখনও পাওয়া যায়নি। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টির আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। খারাপের তালিকায় বেসরকারি ব্যাংক ১৩টি। আর সব ব্যাংকেও স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাব রয়েছে।
আরো বিপর্যয় হবে
হঠাৎ করে সাধারণ সভা ডেকে ব্যাংকের পরিচালক, চেয়ারম্যান ও এমডি বদলানো হচ্ছে। কোনো নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থেকে ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তন করা হচ্ছে না। ফলে আমানতকারীরা বিরাট ঝুঁকিতে পড়েছেন। এতে ব্যাংকিং লেনদেনের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। আমানতকারীরা বিভিন্ন ব্যাংকে ব্যাপক হারে ডেপোজিট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর ব্যাংকিং খাতের দ্রুত পতনের এ গতিতে উদ্বিগ্ন এ খাতের পেশাজীবীরাও। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির কারণে বড় পদের কর্মকর্তাদের গ্রেফতার আতঙ্কসহ সবার মাঝেই বিরাজ করছে চাকরি হারানোর ভয়। আর ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে আমানতকারীদের আস্থা উঠে যাওয়ায় ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোতেও অস্থিরতাসহ নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যা দেশের পুরো অর্থনীতিকেই ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র বলছে, একটি বেসরকারি ব্যাংকে মাত্র ১০ শতাংশ অর্থের মালিকানা হচ্ছে পরিচালকদের। বাকি ৯০ শতাংশ টাকা সাধারণ মানুষদের। মাত্র ১০ শতাংশ অর্থের মালিকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আইন পাস করা হলো। সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন তা আরো বাড়িয়ে দেবে। কার্যত ব্যাংকিং খাতে লুটপাট এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটেড ঋণের পরিমাণ বাড়বে। যা দেশের অর্থনীতিকে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে ছাড়বে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও একাধিকবার ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এমনকি জাতীয় সংসদেও একাধিকবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্যাংকখাত।  
ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলায় সরকারের সাফল্য ম্লান: সংসদে সরকার দলীয় এমপি
ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলার কারণে সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম। ১৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইসরাফিল আলম বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে রাষ্ট্র পরিচালনার সংকট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে ব্যাংক খাত নড়বড়ে অবস্থায় পড়েছে। ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টিতে আর্থিক অবস্থা ছিল দৃশ্যমানভাবে খারাপ। অন্য ব্যাংকগুলোতেও কমবেশি সুশাসনের অভাব ছিল। ইসরাফিল বলেন, খেলাপি ঋণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। নামে-বেনামে ইচ্ছামতো ঋণ নেয়া হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালক, নির্বাহী, বড় কর্মকর্তারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত। এর জন্য তদন্ত দরকার নেই। খোলা চোখে মানুষ দেখেছে, জেনেছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়, সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ব্যাংক খাতের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বৃদ্ধি পাওয়ার বদলে দুর্বল হয়েছে। কিছু কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, যা জোড়াতালি দেয়ার মতো। নওগাঁ থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় এমপি ইসরাফিল বলেন, ‘সরকারের প্রচেষ্টা নেই, আইন নেই, জনবল নেই-এ কথা বলতে পারি না। কিন্তু যারা এসব আইন প্রয়োগের দায়িত্বে আছে, প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে তাদের ব্যর্থতার জন্য আর্থিক সেক্টর বিপর্যয়ের মুখে, বিপন্নতার মুখে পতিত হয়েছে তার দায়িত্ব সরকার ও সংসদকে গ্রহণ করতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগকেও বহন করতে হচ্ছে।’ তিনি ঋণ খেলাপিদের নাম ঘোষণা করা, কুঋণ সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করার দাবি জানান।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ
এ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের কাছে জিম্মি ছিল ব্যাংকিং খাত। তখন বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করে অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়েছিলেন। এখন তারই দল এবং একই আদর্শের অনুসারীরা পরিবারভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে- যা পুরো ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে দেবে। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো বিপর্যয়ের শেষ প্রান্তে। এবার ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলোতেও একই ঘটনা ঘটছে- যা উদ্বেগজনক। ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলো অনেকটা জোরপূর্বক দখল করে নেয়া হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুগতদের ব্যাংক দেয়া ঠিক হয়নি। শুরুতে বিভিন্ন পক্ষ বিরোধিতা করেছিল। আজ সেটা সত্য প্রমাণিত হল। এরপর আরো নতুন ব্যাংক দেয়া হচ্ছে। মূলত নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত যতটা এগিয়েছে তার থেকে বেশি পিছিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এখন কোনো সংস্কারে আর কাজ হবে না। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সঠিকভাবে হিসাব রাখা ও অডিট করা হলে এবং তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা আনা হলে দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি আছে। এ জন্যই বড় বড় অনিয়ম হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ক্রমশই সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই। এসব বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, গত বছরের শুরুতে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ ছিল। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল বেসরকারি অধিকাংশ ব্যাংকের অবস্থা আরও নাজুক। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল কম্পিটিভনেস রিপোর্ট ২০১৭-১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অস্থিরতার চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ৫১ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন- ব্যাংকিংখাতে অনিয়ম রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন কমানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বড় আকারের মন্দ ঋণ আদায় হচ্ছে না। বড় বড় কোম্পানির কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক-গবেষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ব্যাংক খাতের দুরাবস্থার জন্য দায়ী করেছেন রাজনৈতিক কারণকে। পাশাপাশি সুশাসনের অভাবে আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান বলেছেন, অর্থনীতি বিকাশে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং খাত জরুরি। দেশের ব্যাংকিং খাতে সংকট চলছে। নৈতিকতার অভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা, রাজনৈতিক ও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ড. রেহমান সোবহান বলেন, ব্যাংক ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি। আর খেলাপিদের জন্য এক ধরনের উদ্ধার তৎপরতা দেখা যায়। তার মতে, খেলাপিরা প্রায় সবাই এলিট শ্রেণির। তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা রয়েছে। ঋণের সুদের হার (কস্ট অব লেন্ডিং) সবার জন্য এক রকম নয়। একেকজন একেক রেটে ঋণ পাচ্ছে। প্রতিযোগিতার বাজার প্রায় ধ্বংস হয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বাংলাদেশ ব্যাংক) বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে। সবকিছুতেই রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)