বৃহস্পতিবার, ২১-জুন ২০১৮, ১০:১৩ পূর্বাহ্ন

রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০২ মার্চ, ২০১৮ ০৩:৫৪ অপরাহ্ন

হানজালা শিহাব: আইনি জটিলতায় আটকে আছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্জন কারাগারেই আছেন তিনি। ৭৩ বছরের একজন শারীরিক অসুস্থ নারী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সংসদের সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা ও একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্জন কারাগারে রাখাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করছেন দলটির নেতারা। এদিকে, দলের চেয়ারপারসনের জামিনের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আইনি সব প্রক্রিয়াই চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি, রোববার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আইনি মারপ্যাঁচে আটকে ছিল জামিন প্রক্রিয়া। আইনজীবীদের তথ্যমতে, মার্চের ১১ তারিখের আগে তার জামিনের কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি বেগম জিয়ার জামিন পেতে আরো বেশকিছু দিন সময়ও লেগে যেতে পারে। এ মামলায় জামিন হলেও নির্বাচনের আগে আদৌ তিনি বের হতে পারবেন কিনা- এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়াকে নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছে সরকার। যে কারণে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যে শুরুর দিকে ‘নমনীয়’ মনে হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো। যদিও বিষয়টি আদালতের, তথাপি এখানে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন হচ্ছে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। তারা বলছেন, আদালতে জামিন আবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ বিরোধিতা না করলে ২৫ ফেব্রুয়ারিই হয়তো জামিন পেতে পারতেন বেগম জিয়া। অবশ্য, এদিন উচ্চ আদালতের বক্তব্যে শুরুতে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ আদালতে উপস্থিত সবাই ধরেই নিয়েছিলেন যে, খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হবে। কিন্তু অবশেষে আদালত সিদ্ধান্ত ঘোষণার বিষয়টি নথি না পাওয়া পর্যন্ত মূলতবী রাখেন। এতে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। অবশ্য উচ্চ আদালত জামিন দিলেও সরকার না চাইলে কারা মুক্তি পাবেন না বিএনপি চেয়ারপারসন, এটা সবাই বোঝেন। কারণ, চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করে জামিন আটকে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোরও সুযোগ আছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ইতিমধ্যেই বলেছেন, খালেদা জিয়াকে নতুন কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়নি, হবে না। আর আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে খালেদা জিয়ার জামিন ঠেকাতে চান না বলেও বক্তব্য দিয়েছেন।
কিন্তু সে দৃশ্যপট কিছুটা পাল্টে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি সূত্র বলছে, সরকারের ভেতরের লোকজনও এখন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারছেন না। এ মুহূর্তে খালেদা জিয়াকে জামিন দিলে তাদের লাভ নাকি নির্বাচন পর্যন্ত কারাগারে রাখলে তারা বেশি লাভবান হবেন- এমন সিদ্ধান্তহীনতায় আছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এ কারণেই খালেদা জিয়ার রায়ের সার্টিফায়েড কপি পেতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। জামিনেও সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। আর কারামুক্তিতে সময় আরো দীর্ঘায়িত হবে বলেই ধারণা রাজনৈতিক সচেতন মহলের।
অপরদিকে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে বেগম জিয়ার রায়ের নথি পাঠাতে বিচারিক আদালতকে ১৫ কার্যদিবস সময় দিয়েছেন। তার মানে হচ্ছে, এই ১৫ দিনের মধ্যে খালেদা জিয়ার জামিনের কোনো সম্ভাবনা নেই। এটা আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তার আইনজীবীরা। এ জন্য বারবার তারা দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও আইনি বিষয়ে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।
তবে বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, এমন পরিস্থিতিতেও মোটেই হতাশ নয় দলটির নেতাকর্মীরা। বরং বিএনপি নেতাকর্মীরা ‘জ্বলে-পুড়ে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছে’ বলে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন। এদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে দলের নেতাকর্মীরা সরকারের উস্কানিতে ‘পা’ না দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যেকোনো সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার এই কারাদ-ই দেশের রাজনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন আলোচনাই এখন সারাদেশে শোনা যাচ্ছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই সাজানো মামলায় দ- দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনবার যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের যিনি প্রধান, তিনি চাইলে মুহূর্তের মধ্যে হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পারতেন। এতিমদের ২ কোটি টাকা তিনি আত্মসাত করেছেন- এটা কেউ বিশ্বাস করে না। বরং এটা ‘মাইনাস ওয়ান ফর্মূলা’ হিসেবেই দেশবাসী দেখছে। সুযোগ পেলে জনগণ আগামী নির্বাচনে এর সমুচিত জবাব দেবে। বিএনপি নেতাদের দাবি, ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে খালেদা জিয়াকে জেলে পুরে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায়। দেশে একদলীয় শাসন কায়েম পাকাপোক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাগারে রাখায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের ১০ লাখ ভোট কমছে, বিএনপির ১০ লাখ ভোট বাড়ছে। তবে আওয়ামী লীগ এ হিসাব মানতে নারাজ।     
আলোচিত ২৫ ফেব্রুয়ারি
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের কারাদ- হয় খালেদা জিয়ার। ২০ ফেব্রুয়ারি ওই রায়ের বিরুদ্ধে এবং তার জামিনের পক্ষে হাইকোর্টে আপিল করেন বেগম জিয়ার আইনজীবীরা। ২৫ ফেব্রুয়ারি রোববার জামিন শুনানির নির্ধারিত দিনে দুপুর আড়াইটার দিকে শুনানি শুরু হয়। সারা দেশে এ নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। সবাই চেয়ে থাকে উচ্চ আদালতের দিকে। কিন্তু, প্রায় ঘণ্টাখানেক শুনানির পর বিচারপতি এনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি শহিদুল করিম তাদের সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য নথি আসা পর্যন্ত সময় নেন। পরে হাইকোর্ট চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেন শতাধিক বিএনপিপন্থী আইনজীবী।
অবশ্য শুনানি শুরু হওয়ার আগেই আদালতের এজলাস কক্ষে বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকশ আইনজীবী ভিড় করেন। দুপুর ২টার পর এজলাসে ঢুকে বিচারকরা এত মানুষ দেখে চরম বিরক্তি প্রকাশ করে এজলাস থেকে বেরিয়ে যান। সেই সাথে ১০ মিনিটের মধ্যে আদালতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বিএনপিপন্থী অনেক আইনজীবীকে এজলাস থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। মিনিট পনের পর এজলাসে ফিরে বিচারপতি এনায়েতুর রহিম আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন- ‘এভাবে চাপ সৃষ্টি করে কাজ হয় না।’ পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বয়সের কারণে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার প্রয়োজনের যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি বলেন- তিনবারের নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রী জামিন পাওয়ার যোগ্য। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে জামিনের আবেদন চ্যালেঞ্জ করেন। বিকেল সাড়ে ৩টার পর শুনানি শেষ হয়। তবে, জামিন শুনানি শেষ হলেও কোনো আদেশ দেননি আদালত।
এর আগে, ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রায় ঘোষণার ১২দিন পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা রায়ের সার্টিফায়েড কপি হাতে পান। ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আপিল (আপিল নম্বর ১৬৭৬/২০১৮) করেন। আপিলের ফাইলিং আইনজীবী হন আবদুর রেজাক খান। ৪৪টি যুক্তি তুলে ধরে এ আপিল করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া সাজার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জামিন আবেদনের ওপর শুনানির জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন। ওইদিন স্থগিত করেন তার অর্থদ-।
কী আছে রায়ের কপিতে?
১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে ১১৭৪ পৃষ্ঠার রায়ের এ কপি পান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বকশীবাজারে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালতের কার্যালয় থেকে রায়ের অনুলিপি খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘আসামি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাঁকে দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক ৫ (পাঁচ) বছরের সশ্রম কারাদ- এবং আসামি তারেক রহমান, কাজী সালিমুল হক ওরফে কাজী কামাল, শরফুদ্দীন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় দ-বিধির ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক ১০ (দশ) বছরের সশ্রম কারাদ- এবং বর্ণিত সকল আসামিকে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। তবে রায়ে ৪০৯/১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়ার কথা বললেও এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি বলে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানা উল্লাহ মিয়া। তিনি বলেন, ৪০৯ ধারায় যে সংজ্ঞা আছে তার আওতায় খালেদা জিয়া পড়েন না। উচ্চ আদালতে এই সাজা টিকবে না। তিনি বলেন, রায় প্রস্তুত হওয়ার আগে রায় দেয়া হয়েছে। এ জন্য রায়ের কপি পেতে ১২ দিন দেরি হলো। রায় ৬৩২ পৃষ্ঠা হলেও সার্টিফায়েড কপি ১১৭৪ পৃষ্ঠা হয়েছে। রায় পাওয়ার পর খালেদা জিয়ার অন্যতম প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রায়ে একই কথা বলা হয়েছে, ট্রাস্টের টাকা বিভিন্ন ব্যক্তি তুলেছেন। শেষ পর্যন্ত এটা আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে রায়ে খালেদা জিয়া কীভাবে সম্পৃক্ত তা বলা হয়নি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ট্রাস্টের টাকায় হাতও দেননি। কুয়েতের আমিরের পাঠানো টাকা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে দুটি ট্রাস্টে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া ট্রাস্টি নন। তার সাথে সম্পৃক্ত নন। অন্যদিকে রায়ে অর্থদ-ের টাকা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ কর্তৃক প্রত্যেকে সম অংকে প্রদান করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, আরোপিত অর্থদণ্ডের টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত বলে গণ্য হবে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তাদের প্রত্যেককে ওই টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
প্রশ্নবোধক-দাড়ি চিহ্ন নিয়ে বিতর্ক
খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করে আদালতে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, দেশে এখন গুম, খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা চলছে। কেউ প্রতিবাদ করতে পারছেন না। ‘আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি?’ রায়ে খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে বিএনপির আইনজীবীরা দাবি করেছেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, ‘আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি?’ খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) তুলে দিয়ে রায়ে দাড়ি (।) দিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বেগম জিয়া তার অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। তাহলে তো এ মামলা এত দূর পর্যন্ত আসার কথা না। এটা তো পাগলেও বিশ্বাস করবে না যে, বেগম জিয়া তার অপরাধ স্বীকার করে বলেছেন -আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি। এটা তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। যার ওপর ভিত্তি করে তাকে সাজা দেয়া হয়েছে। আমরা রায়ের কপি ও চেয়ারপারসনের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যের কপি বারবার দেখেছি। আপিলেও এটি তুলে ধরা হয়েছে। আমরা আশা করছি, উচ্চ আদালতে বেগম জিয়া ন্যায় বিচার পাবেন, তিনি বেকসুর খালাস পাবেন।  
খালেদা জিয়ার কারাবাস রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার বিষয়টিকে রাজনীতির জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন বিএনপি নেতারা। একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার সাজার প্রতিক্রিয়া ব্যাপক ও গভীর হবে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাগারে একটি পরিত্যক্ত ভবনে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনও মানুষ নেই, অন্য আসামিও নেই। যেভাবে ফাঁসির দ-প্রাপ্তদের নির্জন কারাবাসে রাখা হয়, সেভাবেই তাকে রাখা হয়েছে। এছাড়া তিনবারের একজন প্রধানমন্ত্রীকে ডিভিশন দেয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক টালবাহানা হয়েছে। এভাবে কারাগারে রাখার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইন পরিপন্থী বলেও মনে করেন বিএনপি নেতারা। খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাবাস থেকে স্বাভাবিক কারাগারে রাখতে সরকারের কাছে দাবিও জানিয়েছেন তারা। খালেদা জিয়া একদিন জেলে থাকলে বিএনপির ১০ লাখ করে ভোট বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য। বিএনপির ওই নীতিনির্ধারক মনে করেন, খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য যে বিলম্ব হচ্ছে, এতে বিএনপির লাভ হয়েছে, ভোট বাড়ছে। জেলে থাকার বিষয়টি বিএনপির জন্য প্লাস পয়েন্ট আর আওয়ামী লীগের জন্য মাইনাস পয়েন্ট। সেই সাথে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন দলের মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, ‘আগামী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ এই মিথ্যা মামলার জবাব দেবে।’
বিএনপি আরো ধৈর্য্য ধরবে
হাইকোর্ট থেকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন না হওয়ায় কিছুটা ক্ষুব্ধ বিএনপি। তবে তারা আরো ধৈর্য্য ধরার পক্ষে। সে অনুযায়ী আগামী পদক্ষেপ নেবেন দলটির নেতারা। ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন না পাওয়ার পর কোর্টে আইনজীবী সমিতিতে এবং আগের দিন বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আইনজীবীদের বৈঠকের পর এমন মত এসেছে। হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার জামিনের সিদ্ধান্ত না হওয়ার পরপরই সিনিয়র আইনজীবীদের নিয়ে বৈঠক করেন মির্জা ফখরুলসহ দলটির নীতিনির্ধারকরা। সেখানে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- নিম্ন আদালত থেকে নথি দ্রুত উচ্চ আদালতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। এ জন্য বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে দায়িত্ব দিয়ে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়াও বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে যে ৫টি মামলায় ওয়ারেন্ট রয়েছে, সেগুলোর আনুসঙ্গিক কাগজও প্রস্তুত রাখার কথা বলেছেন দলের মহাসচিব। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কনফারেন্স রুমে ওই বৈঠক হয়। এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আশা করেছিলাম আজই (২৫ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট জামিন দিয়ে দেবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় আমরা কিছুটা হতাশ। কিন্তু আমরা বসে নেই। আইনি ও রাজপথ দুই দিকেই লড়াই চলবে। ‘পরবর্তী পদক্ষেপ কী’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ১৫ দিনের মধ্যে মামলার নথি চেয়ে হাইকোর্টের চিঠি রিসিভ করেছেন নিম্ন আদালত। এখন আমরা চেষ্টা করবো দুই-তিন দিনের মধ্যে এই নথি উচ্চ আদালতে যাতে আসে। নিম্ন আদালতের সংশ্লিষ্ট দফতর দেরি করলে তাও আমরা পিটিশনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের নজরে আনব। যত দ্রুত সম্ভব এই নথি এনে আমরা জামিন প্রার্থনা করবো। তবে উচ্চ আদালত ১৫ দিন সময় দেয়ায় সরকার পক্ষ না চাইলে নির্ধারিত সময়ের আগে নি¤œ আদালত থেকে নথি যে উচ্চ আদালতে পৌঁছাবে না, সেটা নিশ্চিত করেই বলেছেন হাইকোর্টের একাধিক আইনজীবী।
বিএনপির নতুন কর্মসূচি আসছে!
দলীয় একটি সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার মুক্তি ত্বরান্বিত এবং সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক নতুন কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ বিভাগে জনসভা করার চিন্তাভাবনাও এসেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দলটির নীতিনির্ধারকদের জরুরি বৈঠকে এমন আলোচনা হয়। তবে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জনসভার আগে দুদিনের লিফলেট বিতরণ ও পেশাজীবীদের সঙ্গে জেলায় জেলায় মতবিনিময় করার কর্মসূচি আসতে পারে। জামিন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে জনসভার মতো বড় ধরনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই বৈঠকে। এ বিষয়ে দ্রুতই ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বিএনপির কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচিতে পুলিশের নির্বিচারে লাঠিচার্জ, নেতাকর্মীদের উপর জলকামানের রঙিন গরম পানি প্রয়োগ এবং গণগ্রেফতারের মধ্যেও শান্ত ছিল বিএনপি। কর্মসূচির পূর্ব অনুমতি না থাকার কথা বলে পুলিশ এসব হামলাকে ‘হালাল’ করার চেষ্টা করেছে। তবে বিএনপি মহাসচিব সেই দিন দুপুরেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ঘরের মধ্যে কর্মসূচি পালন করতেও কি পুলিশের অনুমতি লাগবে? শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি- এটা তো সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এমন পরিস্থিতি হলে আগামী দিনে বিএনপি পুলিশের অনুমতির ওপর নির্ভর করবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলটির মহাসচিব। অবশ্য সরকারি উস্কানি এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের ব্যাপারেই বিএনপি এখনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।  
সরকারের অর্জন কী?
অনেকে বলছেন, বিষয়টি রহস্যজনক। এ মুহূর্তে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খালেদা জিয়ার কারাবাস। হাইকোর্টে জামিন শুনানির সময় বিচারপতিদের ইতিবাচক কমেন্টে সবাই আশাবাদি হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ‘নথি আসার পর জামিনের সিদ্ধান্ত’- ঘোষণায় হতাশা দেখা দেয়। জামিন হবে কিনা, কবে হবে -তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। জামিনে আদৌ খালেদা জিয়া শিগগিরই বেরিয়ে আসতে পারবেন কিনা তা নিয়েও বিশ্লেষকরা সন্দিহান। অবশ্য, আদালত এ ব্যাপারে বিএনপিকে ধৈর্য্য ধরে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ভেবেছিল, খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে রাখলে জনগণ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আওয়ামী লীগের পক্ষে মানুষের সমর্থন বাড়বে। বিএনপি ভেঙে যাবে। কিন্তু হয়েছে উল্টো। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতিত রাজবন্দী খালেদা জিয়ার প্রতিই জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন-সহানুভূতি বেড়েছে। যদিও সরকারি দল বুঝেও তা স্বীকার করতে চাচ্ছে না।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট ভাঙা সহজ হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আলামত নেই। ভাঙার পরিবর্তে বিএনপি আরো শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিগত দিনের আন্দোলনে যারা মাঠে নামেননি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর তারাও মাঠে নেমেছেন। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন না। বরং প্রত্যেকটা কর্মসূচিতে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢল নামছে। যা সরকারের মাথাব্যথা বাড়িয়েই দিয়েছে।
সরকারি মহলের একটা পরিকল্পনা ছিল, বিএনপি সহিংস আন্দোলনে গেলে সেই সুযোগে দলটিকে ঘায়েল করা যাবে। বারবার এমন উস্কানিও দিয়ে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু এ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের পাতানো ফাঁদে পড়েনি। বরং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেয়া হবে বলে আগাম আশ্বাস দেয়া হলেও পরে সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে তারা যে কালো পতাকা প্রদর্শনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিল তাতেও পুলিশী হামলা, জলকামান ও গণগ্রেফতার চলে। এতে বস্তুত সরকারের সিদ্ধান্তহীনতাই ফুটে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়াকে জেলে পুরে এ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের অর্জন ‘শূন্য’। বরং লাভবান হয়েছে বিএনপি-ই। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে। এ মুহূর্তে খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এলে জনস্রোত তৈরি হবে কিনা? যেমনটা দাবি করছে বিএনপি। অপরদিকে বয়োবৃদ্ধ একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে দীর্ঘদিন জেলে রাখাটা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে কিনা? এতে দেশে ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপট তৈরি হবে কিনা- তাও সরকারের মাথাব্যথার কারণ। যদিও সরকারের-এমপি-মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন, কারো জন্য নির্বাচন থেমে থাকবে না। খালেদা জিয়ার বিষয়টি আদালতের। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে। আদালতের মাধ্যমেই তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারা-না পারাও আদালতের বিষয়। তবে দেশবাসীর ধারণা, সরকারই খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সব কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। এ অভিযোগ বিএনপি নেতাদেরও।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)