শনিবার, ২৩-জুন ২০১৮, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রতিবাদের নামে রাজউকের মিথ্যাচার ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

প্রতিবাদের নামে রাজউকের মিথ্যাচার ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৫ মার্চ, ২০১৮ ০৮:২৮ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: ভুয়া কাগজপত্রে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রাজধানীর রমনায় সরকারি জমিতে বোরাক রিয়েল এস্টেট অবৈধ ‘ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন’ নির্মাণ করেছে। বিষয়টি জানার পরও ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র ও প্ল্যান অনুমোদন দেয়া এবং নির্মাণে বাধা না দেয়ার কারণ হিসেবে শীর্ষকাগজের অনুসন্ধানে রাজউক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। এ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা যায়, রাজউকের এ সংক্রান্ত ফাইলই গায়েব হয়ে গেছে। শীর্ষকাগজের গত ১৪তম বর্ষ ৩৩তম সংখ্যায় এ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদনসহ আগে-পরে আরো একাধিক সংবাদ ছাপা হয়। তবে ৩৩তম সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পড়ে বেশ উত্তেজিত হন রাজউক চেয়ারম্যান। কিন্তু সংবাদের প্রতিবাদ না দিয়ে শীর্ষকাগজ সম্পাদককে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ বেশ হম্বিতম্বি করেন রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান। এদিকে তথ্য অধিকার আইনে তথ্যের নির্ধারিত ফি ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিয়ে ‘ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন’ সংশ্লিষ্ট তথ্য চেয়ে রাজউকে আবেদন করেছিল শীর্ষকাগজ। এতে সুস্পষ্ট ৪টি তথ্যের কাগজপত্রের ফটোকপি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজউক তা সরবরাহ না করে প্রতারণা করে শীর্ষকাগজের প্রতিবেদকের সঙ্গে। যা গত ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত শীর্ষকাগজের ৩৬ তম সংখ্যায় তুলে ধরা হয়। শীর্ষকাগজের একই সংখ্যায় অবৈধ ‘ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন’র জমির কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়া নিয়ে আরো একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তবে শীর্ষকাগজের সব প্রতিবেদনের প্রতিবাদ দেয়ার সাহস না থাকলেও দু’টি প্রতিবেদনের কয়েকটি লাইনের প্রতিবাদের নামে মিথ্যাচার করেছে রাজউক কর্তৃপক্ষ। রাজউক তাদের প্রতিবাদপত্রে বলেছে, তথ্য অধিকার আইনে শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে রাজউকের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল তা সবই নাকি তারা সরবরাহ করেছে। বাস্তবে তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
রাজউকের প্রতিবাদপত্র
গত ১১ জানুয়ারি সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের অফিসে রাজউকের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়। শীর্ষকাগজের ৩৩ তম সংখ্যায় ‘অবৈধ ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন: রাজউক চেয়ারম্যানও জড়িত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদে রাজউক বলছে, গত ২০ নভেম্বর-২০১৭ তারিখে সংবাদে বলা হয়েছে, ‘রমনায় বিটিসিএল ভবনের উল্টোপার্শ্বে অবৈধভাবে ইউনিক হাইটস নামে বোরাক রিয়েল এস্টেটের যে ২০ তলা সুউচ্চ ভবন গড়ে উঠেছে এই অনিয়মের সঙ্গে রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমানও জড়িত রয়েছেন। আর এ কারণে ভবনটির নির্মাণ সংক্রান্ত কোনও ফাইলপত্র রাজউকে পাওয়া যাচ্ছে না।’ যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট। উক্ত নথিটি রাজউকের রেকর্ডে সংরক্ষিত আছে বলেও দাবি করে প্রতিবাদে আরো বলা হয়, বর্ণিত ভবনটির নকশা বর্তমান চেয়ারম্যানের রাজউকে যোগদানের অনেক আগে অনুমোদিত। একই সাথে ৮ জানুয়ারি শীর্ষকাগজে ‘প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাজউক চেয়ারম্যানের হম্বিতম্বি, তবে প্রতিবাদ দিলেন না’ শীরোনামে প্রকাশিত সংবাদের একটি অংশের প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজউক কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘অবৈধ ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন: রাজউক চেয়ারম্যানও জড়িত- প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ওইদিনই রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান শীর্ষকাগজ সম্পাদককে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ বেশ হম্বিতম্বি করেন।’ কথাটি সঠিক নয়। বস্তুত, প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর চেয়ারম্যান ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশের কারণ জানতে চান। ফোনালাপের সময় শীর্ষকাগজ সম্পাদক বিভিন্ন তথ্য জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান সম্ভাব্য তথ্য প্রদান করেন এবং তথ্য অধিকার আইনের অধীনে তথ্য চাইলে রাজউক থেকে সরবরাহ করা হবে বলে জানান।  সে অনুযায়ী তথ্য চাইলে রাজউক থেকে তা সরবরাহ করা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ না করার জন্যও শীর্ষকাগজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয় প্রতিবাদ লিপিতে।
প্রতিবেদকের বক্তব্য
বোরাক রিয়েল এস্টেট নির্মিত ‘ইউনিক হাইটস ২০ তলা’ সুউচ্চ ভবনের কাগজপত্র এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রিপোর্টে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। শুরু থেকেই যা নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া কাগজপত্রের জমিতে ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র ও নকশায় অনুমোদন দেয়ার দায় কোনোভাবেই রাজউক এড়াতে পারে না। আর বারবার যোগাযোগ করেও রাজউক চেয়ারম্যান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে তিনি প্রথমদিকে না থাকলেও পরবর্তীতে এসে এ অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ফাইল গায়েব হওয়া এবং এখন পর্যন্ত অবৈধ এই ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে যে, তিনি এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। অপরদিকে, তথ্য অধিকার আইনে রাজউকের কাছে যে তথ্য শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে চাওয়া হয়েছিল তা সরবরাহ করার দাবিও সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ বিষয়ে রাজউকের দেয়া তথ্যের নামে প্রতারণার বিষয়টিসহ ‘ইউনিক হাইটস ২০ তলা ভবন’ ও রাজউকের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে শীর্ষকাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণাংশ পাঠকদের বিবেচনার জন্য নিচে তুলে ধরা হলো-  
আবেদনের পর রাজউক যে তথ্য দিয়েছে
তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে গত ৩ ডিসেম্বর রাজউকের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ইউনিক হাইটস সংক্রান্ত তথ্যের জন্য আবেদন করেন শীর্ষকাগজ সম্পাদক নিজে। এর পর তথ্যের নির্ধারিত ফি বাবদ সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে চালানে ২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়। যার চালান নং ৬৭ ও তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭। কিন্তু, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী রাজউকের কাছে যেসব তথ্যের ফটোকপি চাওয়া হয়েছে তার একটিরও ফটোকপি দেয়া হয়নি। গত ১ জানুয়ারি রাজউকের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিচালক (জোন-৫) মো. শাহ আলম চৌধুরীর স্বাক্ষরে ইস্যু করা এক চিঠিতে ইউনিক হাইটস ভবন নির্মাণের অনুমোদন সংক্রান্ত ঘটনার শুধুমাত্র তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। কোনও তথ্যের ফটোকপি দেয়া হয়নি। যদিও তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী এসব তথ্যের ফটোকপি দিতে রাজউক বাধ্য। উল্লেখ্য, শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে করা আবেদনে বলা হয়েছিল, হোল্ডিং নং ১১৭ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, রমনা, ঢাকা এই প্লটের ইউনিক হাইটস নামে বোরাক রিয়েল এস্টেটের ২০ তলাবিশিষ্ট যে ভবনটি নির্মিত হয়েছে- এই ভবন সম্পর্কে নিম্নলিখিত তথ্য প্রয়োজন: ১. ছাড়পত্রের জন্য বোরাক যে আবেদন করেছিল এবং যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছিল সবগুলোর ফটোকপি। ২. রাজউকের যে সভায় ছাড়পত্রের সিদ্ধান্ত হয়েছে বা অনুমোদিত হয়েছে সেই অনুমোদন এবং ছাড়পত্রের ফটোকপি। ৩. রাজউকের বিসি কমিটির যে সভায় প্ল্যান পাস হয়েছে সেই সভার কার্যবিবরণীর ফটোকপি। এবং ৪. প্ল্যান অনুমোদনের ফটোকপি। এর প্রেক্ষিতে রাজউজ থেকে লিখিত বলা হয় হয়, হোল্ডিং নং ১১৭ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, রমনা, ঢাকাতে গত ১৭/০৯/২০০৬ তারিখে নগর পরিকল্পনা শাখা হতে ভূমি-ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান করা হয় এবং বিসি কমিটির গত ০৩/১২/২০০৬ তারিখের ২৮তম সভায় ৩টি বেইজমেন্টসহ ২০ তলা আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ইমারতের নকশা অনুমোদন হয়। তবে কোনো তথ্যের ফটোকপি দেয়া হয়নি। অর্থাৎ- শীর্ষকাগজ থেকে চাওয়া তথ্যের কিছুই সরবরাহ করা হয়নি সেটা প্রমাণিত। বরং এটা তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর লঙ্ঘন। যা একটি প্রতারণাও বটে।
চেয়ারম্যানের টালবাহানা সম্পর্কে প্রতিবাদ নেই
শীর্ষ কাগজের গত ৩৩তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘অবৈধ ইউনিক হাইটস ২০তলা ভবন : রাজউক চেয়ারম্যানও জড়িত’ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল মূলত রাজউক চেয়ারম্যানের টালবাহানামূলক ঘটনাবলী বর্ণনা দিয়ে। তথ্য প্রদানের ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান শীর্ষ কাগজ সম্পাদকের সঙ্গে যেসব টালবাহানা করেছেন তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল প্রতিবেদনটিতে। কিন্তু, রাজউকের এই প্রতিবাদপত্রে সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তাতে এটা প্রমাণ হলো যে, তথ্য প্রদানের ব্যাপারে চেয়ারম্যানের লুকোচুরি বা টালবাহানার খবর সত্য। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, চেয়ারম্যান কেন এ ব্যাপারে এতো টালবাহানা বা লুকোচুরি করছেন?
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)