সোমবার, ২৫-জুন ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ন
প্রত্যাবাসন এখনও শুরু হয়নি

লাখো রোহিঙ্গা ভূমিধস বন্যার ঝুঁকিতে

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১১ মার্চ, ২০১৮ ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: রোহিঙ্গাদের জন্য এ মুহূর্তে কোনো সুসংবাদ নেই। প্রত্যাবাসনের চুক্তির পর প্রায় তিন মাস পার হতে চলেছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। বরং এখনো রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছেন। অপরদিকে যারা সেখানে আছেন তাদেরকেও খাদ্য সংকট তৈরির মাধ্যমে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে বলে প্রমাণ পেয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এদিকে কক্সবাজারের পাহাড়ে আশ্রয় শিবিরগুলোতে ঝড় ও বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কক্সবাজারের বালুখালী ও কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে কমপক্ষে এক লাখ শরণার্থী আগামী বর্ষা মৌসুমে ভূমিধস ও বন্যার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি পাহাড়ের খাদে বসবাসকারী প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গার পাহাড়ধসে বিপন্ন হবার আশঙ্কা “গুরুতর ভাবনার বিষয়” বলে মন্তব্য করার একদিন পর ইউএনএইচসিআর এই বিবৃতি দিয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি দেয়া এই বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর-এর জেনেভা অফিসের মুখপাত্র আন্দ্র্রেজ মাহেসিস বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে কমপক্ষে ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা বসতবাড়ি হারাতে পারে।’ গত বছর ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া রোহিঙ্গাদের ঢল সামলাতে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার কুতুপালং, বালুখালী এলাকার ঘন বন উজাড় করে পাহাড়ে নির্মাণ করা হয় হাজার হাজার ঘর। ঘরগুলো পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির কুতুপালং ও বালুখালীতে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা পাহাড়ধস ও বন্যায় মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, রিচ এবং এশিয়ান ডিজাসটার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টার যৌথভাবে এই ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্যাম্পের এক-তৃতীয়াংশ বসতি বন্যায় প্লাবিত হতে পারে। ফলে পাহাড়ের ঢালে বসবাস করা ৮৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ঘরবাড়ি হারাতে পারে। আরো প্রায় ২৩ হাজার শরণার্থী রোহিঙ্গা ভূমিধসের বিপদে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মাণ করা পায়খানা, গোসলখানা, নলকূপ এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, শরণার্থী শিবিরে প্রবেশের রাস্তাগুলো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে, জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে না। একই সাথে ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। জানুয়ারির ১৮ থেকে ২৪ তারিখ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি। সফর শেষে ফিরে গিয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার বরাত দিয়ে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে সাংবাদিকদের বলেন, “এটা নিশ্চিত যে রোহিঙ্গারা সহসাই বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে না।” একদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিলম্ব অন্যদিকে সামনের বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতিহীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এটা রোহিঙ্গাদের জন্য হবে এক দুর্যোগের ওপর আরেক দুর্যোগ। মাত্র একদিনের বৃষ্টিপাতে ভূমিধস ও বন্যায় অসংখ্য বসতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এমনকি হতাহতের ঘটনাও ঘটতে পারে।” শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্যানুসারে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ২৫ আগস্টের পর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তিন হাজার একর পাহাড়ি বনভূমি ইজারা নিয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সেখানে ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমির ওপরও ক্যাম্প গড়ে তুলেছে রোহিঙ্গারা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ‘কিছু ব্যবস্থা’
বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর বলেছে, বাংলাদেশে আসছে বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতিকূল অবস্থা থেকে রক্ষা করতে তারা বাংলাদেশ সরকার ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থার মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পাহাড়ের খাড়া অংশগুলোকে সমান করার কাজ শুরু হবে। এছাড়া আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে কী কী সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে সে সম্পর্কে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বর্ষা মৌসুমের ঝুঁকি সম্পর্কে উখিয়ায় শরণার্থী শিবিরে কর্মরত পরিবেশবিদ ফয়সাল বলেন, “ইউএনএইচসিআর-এর সতর্কবাণী সঠিক। বালুখালী, কুতুপালং, মধুরছড়া ও লাম্বারশিয়া এলাকার ঘন পাহাড়ি বনাঞ্চল কেটে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে হাজার হাজার বাড়ি।” তাদের রান্নার জ্বালানি হিসেবে গাছের পাশাপাশি পাহাড় খুঁড়ে গাছের শেকড় তুলে নেয়া হয়েছে। আবার শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা করা হয়েছে। “গাছ মাটিকে ধরে রাখে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি গাছের ওপর পড়ে। ফলে ভূমিক্ষয় হয় না। এখন যেহেতু পাহাড়ে কোনো গাছ নেই, সেহেতু পানি সরাসরি মাটির ওপর পড়বে। এর ফলে মাটি দুর্বল হয়ে পাহাড়ধস ও ভূমিধস হতে পারে,” -বলেন ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘বসতিগুলো এতই ঘিঞ্জি যে, একটি বড় মাটির চাক ধসে পড়লে নিচে অবস্থিত কমপক্ষে তিন স্তরের বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ বালুখারীর বাসিন্দা আব্দুস সাদিক (২৫) বলেন, সামান্য বাতাস হলেই তার ঘর নড়বড় হয়ে যায়। তিনি বলেন, “জানি না বর্ষায় কতগুলো ঘর টিকবে। তবে, বার্মার মিলিটারি ও মগদের হাতে মরার চাইতে এখানে দুর্ভোগে মরা অনেক ভালো।”
রোহিঙ্গারা কি মিয়ানমারে ফিরতে চায়?
বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এখন মিয়ানমারে ফিরতে নানারকম আপত্তি তুলছেন রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে যথেষ্ট নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও ক্ষতিপূরণ দেয়া না হলে ফিরবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই। তবে হিন্দু রোহিঙ্গারা যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের সাহারা খাতুন জানান, বাংলাদেশে তার এই শরণার্থী জীবন এটাই প্রথম নয়। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশে। নব্বইয়ের দশকে মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে যখন প্রথমবার তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন, সেবার তাকে এখানে থাকতে হয় এক যুগ। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হলে ২০০৩ সালে দেশে ফেরার সুযোগ পান তিনি। সাহারা খাতুনের সেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে টেনে বলেন, ‘বার্মায় ফেরার কিছুদিন পরই ওরা নির্যাতন শুরু করলো। পুনর্বাসনের জন্য যে টাকা পেয়েছিলাম, সেটা ওরা কেড়ে নিলো। মাঝে মধ্যেই মিলিটারি এসে নির্যাতন করতো। ওদের ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে যায় আমার স্বামী। পরে সে মারা যায়। আমার এক ছেলেও নিখোঁজ। এখনো তার খোঁজ পাইনি।’ গতবছর বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর কুতুপালং-এ পলিথিনে ছাওয়া মাটির ঘরের ঘিঞ্জি শিবিরেই থাকছেন সাহারা খাতুন ও তার পাঁচ সন্তান। রোহিঙ্গাদের যে আবারো দেশে ফেরানোর জন্য একটি চুক্তি হয়েছে, সেই খবরটি একান-ওকান হয়ে পৌঁছে গেছে সাহারা খাতুনের কানেও। দেশে ফিরতে চান কি-না এমন প্রশ্নে রীতিমতো আঁতকে উঠলেন তিনি। সাহার খাতুন বলেন, ‘না, না বাবা, আমরা আর ফিরতে চাই না। ওরা যতোই চুক্তি করুক, ওরা আমাদের নির্যাতন করবেই। মরলে আমরা বাংলাদেশেই মরতে চাই। এখানে অন্তত দু’বেলা খাবার খেয়ে শান্তিতে থাকতে পারি।’
কীভাবে প্রত্যাবাসন হবে?
গত ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে অ্যারেঞ্জমেন্ট নামে প্রত্যাবাসন চুক্তিটি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে, প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার করে রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণ করবে মিয়ানমার। আর সেটার পদ্ধতি ও পথনকশাও চূড়ান্ত। সেই মোতাবেক সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে থাকবে পাঁচটি ট্রানজিট ক্যাম্প। প্রত্যেক কর্মদিবসে ৩০০ রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাওয়া হবে সেসব ট্রানজিট ক্যাম্পে। এরপর সেখান থেকে পাঠানো হবে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের দু’টি রিসেপশন ক্যাম্পে। আর রিসেপশন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদেরকে পাঠানো হবে নিজ নিজ গ্রামে, তাদের ঘরবাড়িতে।
কী বলছেন রোহিঙ্গারা?
কিন্তু বাস্তুবতা হচ্ছে, অধিকাংশ রোহিঙ্গারই কোনো ঘরবাড়ি এখন আর অবশিষ্ট নেই। জায়গা-জমিও বেদখল। কবে তাদের বাড়ি-ঘর পুনর্র্নিমাণ হবে আর রিসেপশন ক্যাম্প থেকে কবে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হবে, তা নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা সংকট আর নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি। কুতুপালং ক্যাম্পে একটি মসজিদের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে একজন বলছিলেন, ‘মিয়ানমারের ওরা অনেক চালবাজ। চুক্তি করেছে, কিন্তু এর কোনো বিশ্বাস নেই। সেখানে যদি আমাদের নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী মোতায়েন না থাকে তাহলে আমরা যাব না।’ আরেকজন বলেন, ‘প্রথমেই আমাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। চলাফেরার অধিকার দিতে হবে। আমাদের জায়গা-জমি ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু ওরা তো আমাদের নাগরিকত্বই দিচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে ফেরার পর মিয়ানমারে আমাদেরকে ওরা কতদিন ক্যাম্পে রাখবে সেটাও তো জানি না। ওরা তো আমাদের অনেকদিন ধরেও আটকে রাখতে পারে।’ মিয়ানমার সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের এই যে অবিশ্বাস, তার পেছনে আছে আগের দফার তিক্ত অভিজ্ঞতা আর নির্যাতনের ইতিহাস। এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গারা ফিরতে না চাইলে পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে জটিল। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শুধু রোহিঙ্গারা নন, বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও। সংখ্যায় কম হলেও এখনো প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর বলছে, গত মাসেও নতুন করে ২৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। কক্সবাজারে সংস্থাটির হেড অব অপারেশন্সের দায়িত্বে থাকা কেভিন জে অ্যালেন বলছিলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আগে মিয়ানমারে এখনো অনেক কিছুই করার বাকি আছে। প্রত্যাবাসনের যেকোনো প্রক্রিয়া শুরুর আগে নিশ্চিত করতে হবে সেটা যেন স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও টেকসই হয়। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের বক্তব্যও শুনতে হবে। তাদের নাগরিকত্ব, পূর্ণ নিরাপত্তা ও মিয়ানমারে আইনগত অবস্থানে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা সুস্পষ্ট করতে হবে।’  
‘মিয়ানমারের বিদ্যমান আইন’ মেনে ফিরতে হবে রোহিঙ্গাদের
‘প্রত্যাবর্তন স্বেচ্ছামূলক’ এবং ‘মিয়ানমারের বিদ্যমান আইন মেনে চলার অঙ্গীকার’সহ একটি ডকুমেন্ট সই করেই প্রত্যাবাসী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রাখাইনে ফিরতে হবে। প্রত্যাবাসন ফরমে এমনটি বলা হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় পাঁচ পৃষ্ঠার এই ফরমটিতে ফেরত যেতে আগ্রহী সব পরিবারের পাঁচ বছরের বেশি বয়সী সদস্যদের নাম লিখতে হবে। প্রত্যাবাসন ফরমে প্রত্যেক পরিবার প্রধানকে তার বাবা, মা, স্বামী অথবা স্ত্রীর নামসহ মিয়ানমারে তাদের ঠিকানা লিখতে হবে। এছাড়া যাচাইকরণ ফরমের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের একটি পারিবারিক ছবি এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের বায়োমেট্রিক তথ্য সম্পৃক্ত করতে হবে। তবে ফরমটি পূরণ করার জন্য এখনো বিতরণ শুরু হয়নি। এদিকে কখন প্রত্যাবাসন শুরু হবে সে কথা এখনই বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম। মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, “প্রত্যাবাসন একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই ঠিক কবে থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে এমন নির্দিষ্ট তারিখ আমরা দিতে পারি না।” ২০১৬ সালের অক্টোবর ও গত বছর আগস্ট মাসের পর রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য গত ২৩ নভেম্বর নেপিদোতে একটি চুক্তি হয়। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চি’র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তিন্ত সোয়ে স্বাক্ষর করেন। ওই চুক্তি অনুসারে, ২৩ নভেম্বর থেকে দুই মাসের মধ্যে অর্থাৎ ২৩ জানুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু তা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ শেষেও সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ
রোহিঙ্গাদের দ্রুত তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের দাবিতে সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের নেয়া প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গদের বিক্ষোভের ১০ দিন পর ৩০ জানুয়ারি স্থানীয়রা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার দাবিতে পাল্টা বিক্ষোভ সমাবেশ করল। এ ধরনের বিক্ষোভ এটিই প্রথম বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিন দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক সংলগ্ন উপজেলা পরিষদ গেইটে এই বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ইউনিয়ন পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “উখিয়ার স্থানীয় মানুষ শঙ্কা ও উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে রোহিঙ্গাদের একাংশের অপতৎপরতায় তারা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। তারা নিজেরাই এখন খুনোখুনি করছে। তাদের এখনই ফেরত পাঠাতে হবে। ইতিমধ্যে ছুরিকাঘাত ও পিস্তলের গুলিতে চার রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়েছে। এসব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সরকারকে সহযোগিতা করে আসছিল।”
অপরদিকে, রাখাইনে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পক্ষে ২১ দফা দাবি সম্বলিত যেসব ব্যানার টানানো হয়েছিল, সেগুলো পুলিশ তুলে নিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, “রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়। তাই তাদের আইনানুযায়ী বিক্ষোভ করার অধিকার নেই। আমরা দেখছি কারা এই বিক্ষোভের পেছনে কাজ করছে।” গত ১৯ জানুয়ারি রোহিঙ্গাদের একটি অংশ কুতুপালংয়ে ও সর্বশেষ ২২ জানুয়ারি নৌকাফিল্ড ক্যাম্পের কাছে স্বল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভ করে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত রাখাইনে ফিরে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরোধিতা করা হয় ওই বিক্ষোভ থেকে। তারা বাংলা ও ইংরেজি-উভয় ভাষায় তাদের দাবিগুলো লিখে ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়। এইসব দাবির মধ্যে রয়েছে- মিয়ানমারে নাগরিকত্বসহ শিক্ষা ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। পরে পুলিশ সেগুলো তুলে নেয়।
এদিকে কুতুপালংয়ের (ব্লক ১, ডি) মাঝি শফিউল আলম বলেন, “আমরা রাখাইনে ফিরতে চাই। তবে সেখানকার সরকার যদি আমাদের হক (দাবি) মেনে নেয়। সরকার যদি আমাদের রোহিঙ্গা পরিচয়ে নাগরিকত্ব দেয় ও আমাদের ফেলে আসা সহায় সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়, তবেই আমরা ফিরে যাব।” উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসন সবদিক বিবেচনা করে কাজ করছে?।
প্রত্যাবাসন বিরোধী ২ রোহিঙ্গার জেল
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ‘গুজব’ ছড়ানোর দায়ে দুই রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ২৪ জানুয়ারি এক সপ্তাহ করে জেল দিয়েছে কক্সবাজারের একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) আগের দিন ওই দু’জনসহ তিন রোহিঙ্গাকে আটক করে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, রোহিঙ্গা আব্দুল জব্বার (৩০), আব্দুর রশীদ (২৭) ও আরেক ব্যক্তিকে আটক করে র‌্যাব। এরপর তাদের পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। আব্দুল জব্বার ও আব্দুর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের এক সপ্তাহ করে জেল দেয়া হয়েছে। অপর ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এদিকে গত ২৪ জানুয়ারি র‌্যাব-৭ কমান্ডার মেজর রুহুল আমিন জানিয়েছে, তারা রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইউসুফ (৫০) হত্যার অভিযোগে নূর মোহাম্মদ (৩০) ও আতাউর রহমান (১৬) নামের দুজন রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। নিহত মোহাম্মদ ইউসুফ প্রত্যাবাসনের পক্ষের। আর তাকে হত্যাকারী দল মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিরোধী। র‌্যাব কমান্ডার বলেন, নিহত ইউসুফ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে তার দেশ রাখাইনে ফিরে যেতে সম্মত ছিলেন। অন্যান্য রোহিঙ্গারাও যাতে স্বদেশ ফিরে যেতে সম্মত হয় সেজন্য ওই মাঝি কাজ করছিলেন। কিন্তু হত্যাকারীরা রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি নয়। তারা ইউসুফ মাঝিকে রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কথা বলতে নিষেধ করে। কিন্তু ইউসুফ তাদের কথা মানতে রাজি হননি। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি রাতে ইউসুফকে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকেরা। এর আগে ১৫ জানুয়ারি ইউসুফ আলী নামের আরেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া গত ১৩ জানুয়ারি কুতুপালংয়ের মধুরছড়ার গুলশান পাহাড়ে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন রোহিঙ্গা মমতাজ (৪৫)। রোহিঙ্গা শরণার্থী শহীদুল ইসলাম বলেন, “আরাকানে শত্রুতার জের ধরে আমাদের ভাইয়েরা এখানে ক্যাম্পে মারামারি করছে। যারা ওখানে দুর্বল ছিল, এখানে তারা ক্ষমতাধর। তাই তারা এখানে এসে প্রতিশোধ নিচ্ছে।”
অতিরিক্ত ১০০ পুলিশ মোতয়েন
শরণার্থী ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গত ২৪ জানুয়ারি আরো ১০০ পুলিশ মোতায়েন করেছে বলে জানান কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরোজুল হক টুটুল। উখিয়ার তিনটি স্থানের প্রত্যেকটিতে সমান সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর আগে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে একটি পৃথক পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রস্তুাব করে কক্সবাজার পুলিশ। তারই অংশ হিসেবে এই ১০০ জন বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হলো।
প্রত্যাবাসনে বিলম্ব : হতাশ হিন্দু রোহিঙ্গারা
রাখাইনের মংডুর চিকনমারি থেকে আসা হিন্দু রোহিঙ্গা সুবাস রুদ্র। এখন তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে বাস করছেন। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিলম্বে হতাশ হয়ে পড়েছেন রুদ্র। তিনি একা নন, তার মতো অন্য হিন্দু রোহিঙ্গারাও দ্রুতই ফিরতে চান মিয়ানমারে। এ জন্য শুধু এতটুকু নিশ্চয়তা চাচ্ছেন যে, রাখাইন ফিরে গেলে নতুন করে আক্রমণের শিকার হবেন না। রাখাইন রাজ্যে গত আগস্টে শুরু হওয়া সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় সাত লাখ মুসলিম রোহিঙ্গার সঙ্গে ৫ শ’র মতো হিন্দু শরণার্থীও রয়েছেন। তারা সবাই মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের নাগরিক এবং কালো পোশাক পরা মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের আক্রমণে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে জানান। “কালো পোশাক পরা মুখোশধারী কিছু লোক আগস্টের শেষের দিকে আমাদের গ্রামে হামলে পড়েছিল। তারা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। আমরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হই,” -বলেন রাখাইনের চিকনমারি থেকে আসা শরণার্থী সুবাস রুদ্র। শরণার্থী নিতাই শীল জানান, গ্রামে থাকলে মরতে হবে এমন খবর পেয়ে ১১২টি পরিবার বাংলাদেশে চলে আসে। নিতাই বলেন, “সপ্তাহ খানেক সময় আমরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছিলাম না। গ্রামের চারপাশ কালো কাপড় পরা লোকজন ঘিরে রেখেছিল।” এরপরই তারা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। তবে বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই কমপক্ষে ১২জন পুরুষ নিহত হন বলে জানিয়েছিলেন নিতাই শীল। পরবর্তীতে হিন্দু রোহিঙ্গাদের জন্য স্থানীয়দের উদ্যোগে উখিয়ার কুতুপালং বৌদ্ধ মন্দিরের কাছে একটি শিবির খোলা হয়। কক্সবাজারে অবস্থিত কমিশনার কার্যালয়ের উপসহকারী মো. শামসুদ্দোজা বলেন, “৪৩৯ রোহিঙ্গা হিন্দুকে উখিয়ার হিন্দু পাড়ায় একটি বিশেষ ক্যাম্পে জায়গা দেয়া হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সেখানে একটি পুলিশ পোস্ট বসিয়েছি। নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গা মুসলমানদের থেকে তাদের আলাদা রাখা হয়েছে।”
সরকারের সাথে আলোচনায় শরণার্থী সংস্থা
শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, “গত ১৫ জানুয়ারি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকে আমরা প্রত্যাবাসন যাচাইকরণ ফরমটি চূড়ান্ত করেছি। এতে একটি নতুন সেকশন রয়েছে, যেখানে বলা আছে তারা (রোহিঙ্গা) মিয়ানমারের বিদ্যমান আইন মেনে চলবে এবং তারা কারও প্ররোচনা ছাড়াই স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরছে।” কমিশনার বলেন, “এই ঘোষণাটা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘোষণাই সাক্ষী দেয় যে, আমরা তাদের জোরপূর্বক পাঠাচ্ছি না।” তিনি বলেন, এখন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের জন্য এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা তৈরির প্রথম পদক্ষেপটি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। পরিবার অনুযায়ী প্রত্যাবাসন হবে। তাই আমরা যাচাইয়ের জন্য পরিবার অনুযায়ী শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করব। তালিকাটি মিয়ানমার সরকারের কাছে যাবে প্রথম যাচাইয়ের জন্য। এরপর বাংলাদেশ তাদের জিজ্ঞাসা করবে, তারা প্রত্যাবাসনে রাজি কিনা। তিনি বলেন, “এর পরেই আমরা প্রত্যাবাসী রোহিঙ্গাদের যাচাইকরণ ফরম পূরণের জন্য লোক নিয়োগ করব। পূরণ করা সেই ফরমগুলো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দ্বিতীয় ভেরিফিকেশনের জন্য দেয়া হবে। তারপর প্রত্যাবাসনে আগ্রহীরা নির্ধারিত পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়বে।” সরকার প্রত্যাবাসন ফরম পূরণ করতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর সঙ্গে চুক্তি সই করতে পারে বলেও জানিয়েছেন কমিশনার কালাম। ইউএনএইচসিআর-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য সরকারের কাছ থেকে একটি প্রস্তাব পেয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার চালিয়ে যাচ্ছি।” এদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতির জন্য আরো সময় প্রয়োজন বলে জেনেভা থেকে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। “সঠিক, টেকসই এবং কার্যকর প্রত্যাবাসনের জন্য অনেকগুলো বিষয়ে নজর দিতে হবে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা কোনো আলোচনাই শুনতে পাচ্ছি না। বিশেষ করে নাগরিকত্ব, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অধিকারসহ স্বাধীনভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা, কাজকর্ম ও জীবনধারনের সুযোগ সুবিধা,” বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন ফিলিপ্পো গ্রান্ডি।
মিয়ানমারে না খাইয়ে মারা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের
অ্যামনেস্টির সবশেষ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের না খাইয়ে মারা হচ্ছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সংস্থাটি জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ধ্বংসাত্মক তৎপরতা, নির্যাতন চলছেই। এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে এখন অনাহারে মারছে তারা। রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতা নিয়ে নতুন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এসব কথা বলেছে। গত জানুয়ারির শেষ দিকে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি বাংলাদেশে নতুন করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। রাখাইনে সেনাবাহিনীর চাপিয়ে দেয়া ক্ষুধা এবং অব্যাহত অপহরণ ও লুটতরাজের মুখে কীভাবে তারা পালাতে বাধ্য হয়েছেন, সাক্ষাৎকারে সে কথাই তুলে ধরা হয়। অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাও গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়ে রাখাইন থেকে পালানো হাজারো রোহিঙ্গার বিষয়ে তথ্য নথিভুক্ত করেছে। সীমান্ত পেরিয়ে এখনো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ অব্যাহত আছে। অ্যামনেস্টি বলেছে, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের সম্পদ লুট করছে; তাদের অপহরণ করছে; নারী-পুরুষ-শিশুকে অনাহারে থাকতে বাধ্য করছে। এসব কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য, এই গোষ্ঠীর জন্য এমন একটি অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করা; যাতে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। মানবাধিকার সংস্থাটির অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযান’ অব্যাহত রেখেছে সেনাবাহিনী। এ রকম অভিযানের মুখেই গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন তল্লাশিচৌকিতে রোহিঙ্গাদের অর্থকড়ি ও অন্যান্য জিনিসপত্র লুটে নিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। গ্রামে গ্রামে রোহিঙ্গা বাড়িঘরে গিয়ে তাদের নারী ও তরুণীদের অপহরণও করছে। ফলে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠছে তারা। রোহিঙ্গারা বলছে, বহুমুখী নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে প্রধানত খাদ্যাভাবের কারণেই তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। প্রসঙ্গত, পূর্বে বার্মা নামে পরিচিত বর্তমান মিয়ানমারে শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসলেও ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব হারায়।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ প্রকাশতি)