শুক্রবার, ২১-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৬:২২ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • দুদকের নির্দেশের পরও ভুয়া সনদধারী বিসিআইসি পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ

দুদকের নির্দেশের পরও ভুয়া সনদধারী বিসিআইসি পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ জুন, ২০১৮ ০১:১৩ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: তথ্য গোপন ও ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদে চাকরি নিয়েছেন সরকারের শিল্প বিষয়ক প্রধান সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে (বিসিআইসি)। পদোন্নতি পেয়ে সংস্থাটির পরিচালক, অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও উঠে এসেছেন। ১৯৯৭ সালে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে চাকরি নিলেও বিষয়টি প্রকাশ পায় ২০১৫ সালে। বর্তমানে পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) পদে আছেন এই কর্মকর্তা। নাম মো. লুৎফর রহমান। কিন্তু জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পর প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এমনকি বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে প্রাথমিক তদন্তে এর সত্যতাও পায়। এরপর চূড়ান্তভাবে তদন্ত করে জাল-জালিয়াতির দায়ে দুর্নীতিবাজ পরিচালক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিসিআইসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশও দেয় দুদক। দুদকের ওই নির্দেশের পর এরই মধ্যে ৮ মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
জানা গেছে, দুদকের নির্দেশের পর বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সংস্থাটির পরিচালক (অর্থ) এর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তবে ইতিমধ্যে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সেই তদন্তকাজ এগুচ্ছে না। বরং এটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দিতে মন্ত্রণালয়েরও একটি দুর্নীতিবাজচক্র তৎপর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুর্নীতিবাজ বিসিআইসি পরিচালক লুৎফরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত বছরের ২৩ আগস্ট লিখিত এক নির্দেশ দেয় দুদক। ওই চিঠি পাঠিয়েছেন দুদকের (বিঃ অনুঃ ও তদন্ত-১) পরিচালক একেএম জায়েদ হোসেন খান। যার স্মারক নং -দুদক/অভি:যাচাই-বাছাই/৩৪৭-২০১৭/২২৩৮৬। বিসিআইসির সাধারণ শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পক্ষে মো. জাকির হোসেনের দায়ের করা এক অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক এই পদক্ষেপ নেয়। মো. জাকির হোসেন গত ১০ জুলাই দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এই অভিযোগটি দায়ের করেন। যার অনুলিপি দেয়া হয় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও একই অভিযোগ উঠেছিল বিসিআইসির তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয়  স্থায়ী কমিটি। একই ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হলেও মো. লুৎফর রহমানের জালিয়াতির ঘটনা রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে। নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় বিসিআইসিতে লোক নিয়োগের। বিজ্ঞপ্তিতে ম্যানেজার (পারসোনাল/ অ্যাডমিন/ লেবার ওয়েলফেয়ার, কমার্শিয়াল, মার্কেটিং ও পারচেজ এবং ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ডেপুটি চিফ ফাইন্যান্স অফিসার ও ডেপুটি অডিটর) পদে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। আবেদনকারীদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সঙ্গে ৮ বছর অথবা স্নাতক ডিগ্রির সঙ্গে ১৩ বছর বৃহৎ আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির আলোকে ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ডেপুটি চিফ ফাইন্যান্স অফিসার ও ডেপুটি অডিটর পদে আবেদন করেন মো. লুৎফর রহমান। এরপর তিনি ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে ১৯৯৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিসিআইসিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে যোগদান করেন। কিন্তু লুৎফর রহমান আবেদনপত্রের সঙ্গে যেসব কাগজপত্র দাখিল করেছিলেন তাতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭৮ সালে এসএসসি, ১৯৮০ সালে এইচএসসি, ১৯৮৬ সালে বি.কম (পাস, যার ফল প্রকাশিত হয় ১ মে ১৯৮৭) উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপর তিনি ১৯৯১ সালে মাস্টার্স (ফল প্রকাশ ৩ নভেম্বর) পাস করেছেন। অপরদিকে, অভিজ্ঞতা সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, জানুয়ারি ১৯৮৭ থেকে জুলাই ১৯৮৯ পর্যন্ত নিশান গার্মেন্টস লিমিটেডে অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে, সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ থেকে মার্চ ১৯৯১ পর্যন্ত আলী নওয়াব এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডে এক্সিকিউটিভ (অ্যাকাউন্টস) পদে, জুলাই ১৯৯১ থেকে মার্চ ৯২ পর্যন্ত খালেক অ্যান্ড কোম্পানিতে (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস) অডিটর পদে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের এপ্রিল থেকে মেঘনা সিমেন্ট মিলস লিমিটেডে ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস) হিসেবে কর্মরত আছেন।
নিয়োগের সময় দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মো. লুৎফর রহমান ১৯৯৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যখন বিসিআইসিতে ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে যোগদান করেন, তখন অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেন ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি থেকে। অথচ তিনি নিয়মিত ছাত্র হিসেবে মাস্টার্স পাস করেছেন ১৯৯১ সালের ৩ নভেম্বর। মাস্টার্স পাস থেকে অভিজ্ঞতা গণ্য করা হলে চাকরিতে আবেদনকালে তার অভিজ্ঞতা ছিল ৫ বছর ৪ মাস ৬ দিন। অথচ ওই পদের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল ৮ বছর। অন্যদিকে, তিনি বি.কম পাস করেছেন ১৯৮৭ সালের ১ মে। ডিগ্রি পাস থেকে অভিজ্ঞতার সময়কাল গণ্য করা হলে চাকরিতে আবেদনকালে তার অভিজ্ঞতা ছিল ৯ বছর ১০ মাস ৭ দিন। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল ১৩ বছর। ফলে, তিনি অভিজ্ঞতা সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে যোগদান করেছেন বলে প্রমাণিত হয়।
এর আগে বিসিআইসিতে চাহিদার চেয়ে কম অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে চাকরি নেয়ার অভিযোগে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে, ওই তিন কর্মকর্তা অভিজ্ঞতা জাল-জালিয়াতি করে বিসিআইসির চাকরিতে ঢোকার বিষয়টি নিয়ে ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১০ম বৈঠকে আলোচনা হয়। তাদের তিনজনের ক্ষেত্রে বৈঠকে বলা হয়, চাহিত অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। তারা বেআইনিভাবে চাকরি করছেন। যেহেতু তাদের নিয়োগ অবৈধ ছিল, সেহেতু তাদের সরাসরি বরখাস্ত করে চাকরিকালীন নেয়া সমুদয় অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বৈঠকে। ওই বৈঠকে আরও বলা হয়- বিসিআইসির কর্মকর্তা চৌধুরী ইসরাত শামীমের নিয়োগের সময় ৮ বছরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও তার অভিজ্ঞতা ছিল ৭ বছর ২ মাস ১৯ দিনের। এএইচএম মনিরুল ইসলাম খানের অভিজ্ঞতা ছিল ৬ বছর ১১ মাস ২৮ দিনের। আরেকজনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল ১০ বছর। কিন্তু তার ছিল ৭ বছর ৪ মাস ১ দিনের।
সূত্রমতে, অভিযোগ ওঠায় ইসরাত শামীমকে চিফ অব পার্সোনালের (কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশাসন বিভাগের প্রধান) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনসংযোগ বিভাগের জিএম, মনিরুল ইসলামকে অবসরোত্তর ছুটিতে ও অপরজনকে বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক পদ থেকে সরিয়ে ঢাকা লেদার কমপ্লেক্সের এমডি করা হয়। তবে আজ পর্যন্ত বিসিআইসির পরিচালক লুৎফর রহমানের ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
এতে প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কর্তৃপক্ষের দ্বিমুখী নীতির কারণে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু অভিযুক্ত লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। কর্তৃপক্ষের এ ক্ষেত্রে পাক্ষপাতমূলক আচরণের প্রমাণ মিলে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে দুদক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না কেন- এ নিয়ে সংস্থটির অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ০৭ মে ২০১৮ প্রকাশিত)