শনিবার, ২৩-জুন ২০১৮, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

মুক্তিযোদ্ধা পদক নিলেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ জুন, ২০১৮ ০৮:১৯ অপরাহ্ন

হানজালা শিহাব : একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা। তিনি যে একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও তা বলেছেন। এর আগে শীর্ষকাগজের গত বছরের ২০ নভেম্বর প্রকাশিত সংখ্যায়ও দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা যে একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তা তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছিল। এমনকি তার এই ভুয়া ও জাল-জালিয়াতিমূলক মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলাও চলছে। তাই বলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের –প্রচার-প্রচারণা থেকে বিরত থাকেননি তিনি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হলেও এরই মধ্যে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা মোটা অংকের বিনিময়ে একটি অখ্যাত ও ভূঁইফোড় সংগঠন থেকে মুক্তিযোদ্ধা পদকও নিয়েছেন। সেই সাথে নিজের ছত্রছায়ায় সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দ ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন একটি নতুন সংগঠন। যে সংগঠনের মাধ্যমে নিজের ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ সার্টিফিকেটকে ‘আসল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণান্ত চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী। এদিকে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দুবছর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে আগামী আগস্টে। এর আগে ফের এক বছরের জন্য নিয়োগ পেতে উঠে পড়ে লেগেছেন দেওয়ান মোহাম্মদ হানাজালা। এ ক্ষেত্রে নিজের ছত্রছায়ায় গড়ে তোলা নবগঠিত সংগঠনের মাধ্যমে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আগে থেকে একটি সংগঠন থাকার পর নতুন করে একই ধরনের আরেকটি সংগঠন সৃষ্টি হওয়ায় প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের উকিল নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যেভাবে ক্রেস্ট নিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে স্বাধীনতা একাডেমি ফাউন্ডেশন নামে একটি ভূঁইফোড় সংগঠন থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ক্রেস্ট নিয়েছেন। সম্প্রতি ওই সংগঠনের ব্যানারে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে ক্রেস্ট দেয়া হয়। এ ব্যাপারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এছাড়া রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকও ওই অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন।
সূত্র বলছে, ক্রেস্ট তৈরিসহ পুরো অনুষ্ঠানের খরচ বহন করেছেন দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা নিজেই। আর মন্ত্রীদেরকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর কাজে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম ঠান্ডুকে ব্যবহার করা হয়। অবশ্য এতে ঠান্ডুর বেশ লাভও হয়। ক্রেস্ট তৈরি, অনুষ্ঠানের খরচাদি নির্বাহ করা ছাড়াও তার পকেটে বেশ ভালো অংকের টাকাও ঢুকে। ঠান্ডু এক সময়ের রাকসুর ভিপি। তার একসময়ের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো হলেও ইদানিং এই ভূঁইফোড় সংগঠনটিই তার অন্যতম পুঁজি। তিনি এখন ওই সংগঠনের নামে পদক বিক্রির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নতুন সংগঠনকে উকিল নোটিশ
শিক্ষা ভবন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল স্বাধীনতা কর্মচারী পরিষদ নামে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে নতুন সংগঠন গঠন করে জোরপূর্বক বিনা নোটিশে সব কর্মচারীকে বাধ্য করা হয়েছে প্রধান প্রকৌশলীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পক্ষে প্রচারণা চালাতে। এর অংশ হিসেবে গত ১১ এপ্রিল একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেই অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে বক্তব্য দেন দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা। সূত্রমতে, সম্প্রতি অর্থের বিনিময়ে নেওয়া ভুয়া পদকটিকে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রাখার পুরস্কার হিসেবে প্রচারণা চালানো হয় নবগঠিত এই সংগঠনের মাধ্যমে।
এদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সরকারি কর্মচারী সমিতি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শিক্ষা প্রকৌশল স্বাধীনতা কর্মচারী পরিষদ নামে নতুন সংগঠন করায় প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা, শিক্ষা প্রকৌশল স্বাধীনতা পরিষদের আহ্বায়ক মো. রফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম লোকমান হোসেন, সদস্য সচিব আবু ছাইদ চৌধুরীকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গত ৮ মে সরকারি কর্মচারী সমিতির বর্তমান সভাপতির পক্ষে ফজলে রাব্বি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটের অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম মোল্লা এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।
নোটিশে বলা হয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সরকারি কর্মচারী সমিতির ত্রিবার্ষিক নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটে আব্দুল কাদের সভাপতি এবং আবু ছাইদ চৌধুরী সধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর সব ঠিকঠাক চললেও প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার রোষানলে পড়েন আব্দুল কাদের। তাকে হেনস্থা করতেই শিক্ষা প্রকৌশল স্বাধীনতা পরিষদ নামে সংগঠন দাঁড় করানো হয়। আর এর মূল হোতা প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা। তার চক্রান্তে এ সংগঠনটি করানো হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল স্বাধীনতা কর্মচারী পরিষদ নামের সংগঠনটির সকল কার্যক্রম বন্ধের কথা বলা হয়।
যেভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা চাকরিতে ঢোকার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি, যদিও প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরিতে ঢোকার সময়ই তিনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা এটা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্য যে সকল ক্রাইটেরিয়া সেগুলোও দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার নেই। কিন্তু, ২০০৯ সালে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়স ২ বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিলে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ভুয়া সার্টিফিকেট যোগাড়ের মিশনে নেমে পড়েন এবং অবশেষে সফলও হন। ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি জাল-জালিয়াতি করে একটি সাময়িক মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র যোগাড় করেন এবং এটিকে ব্যবহার করেন চাকরির বয়স বৃদ্ধির কাজে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্রাইটেরিয়া সম্পর্কে যা আছে
২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর সরকার ১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী আইন সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের অবসরের বয়স ৫৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫৯ বছর করার ঘোষণা দেয়। আর তখন থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এরমধ্যে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা অনেকেই ঘুষ দিয়ে, মোটা অংকের অর্থ খরচ করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট যোগাড় করতে থাকে। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্ত রিপোর্টে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা থামাতে সরকার এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেয়। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিবের স্বাক্ষরে সংস্থাপন সচিব বরাবর একটি চিঠি ইস্যু হয়। ‘মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের চাকরি হতে অবসর গ্রহণের বয়স বৃদ্ধি’ শিরোনামে ইস্যু করা ওই চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের চাকরির বয়স বৃদ্ধির বিষয়ে ৪টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, “বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা ২ (দুই) বৎসর বৃদ্ধির আদেশ জারি হওয়ার পর এ সুবিধা নেয়ার জন্য অনেকেই নানা ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সনদ (সার্টিফিকেট) নেয়ার চেষ্টা করে।
২। নিম্নে বর্ণিত মানদণ্ডের আলোকে কোন সরকারি কর্মকর্তা/ কর্মচারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হবে:
যেসব কর্মকর্তা/ কর্মচারী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন;
অথবা যাঁদের নাম মুক্তিবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল; অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল; অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ (সার্টিফিকেট) গ্রহণ করেছেন।
৩। বর্ণিত অবস্থায়, সরকার এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, যেসব কর্মকর্তা/ কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় বা আবেদন করার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেননি অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেট নেননি বা মুক্তিবার্তায়/ গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি- কিন্তু, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন বা সার্টিফিকেট নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ৫৭ বছর চাকুরিকাল পরবর্তী অতিরিক্ত দুই বছর বর্ধিত চাকুরিকাল প্রযোজ্য হবে না।
৪। উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।”
এই প্রজ্ঞাপনের কোনো ক্রাইটেরিয়া-ই দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা পূরণ করতে সক্ষম হননি। কিন্তু তারপরও একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে গোপনে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে ভুয়া সাময়িক মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি চাকরির গুরুত্বপূর্ণ পদে অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন।
দুদকের তদন্তে অভিযোগ খণ্ডন করতে পারেননি প্রধান প্রকৌশলী
প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়ে। দুদকের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এসব অভিযোগের কথা জানিয়ে জবাব চাওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ এপ্রিল, ২০১৬ এক চিঠিতে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার কাছে বক্তব্য চায়। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা ২০১৬ সালের ৯ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যে জবাব দাখিল করেন তাতে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তিনি মোটেই খণ্ডন করতে পারেননি। চাকরিতে প্রবেশের সময় তিনি কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেননি, এ ব্যাপারে হানজালা বলেছেন, ১৯৮১ সালে চাকরির আবেদনের সময় যে সকল তথ্য চাওয়া হয়েছিল তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কোনও তথ্য চাওয়া হয়নি। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ১৯৭৩ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে বায়োডাটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা ঘোষণার প্রভিশন রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই এ ঘোষণা নিজে থেকেই দিয়েছেন। তাছাড়া হানজালা চাকরিতে ঢুকেছেন ১৯৮১ সালে। অথচ ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কোনও দফতরে আবেদন করেছেন মর্মে দালিলিক প্রমাণ নেই। বরং তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি হিসেবেই সবাই বিবেচনা করতো।
দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ প্রাপ্তিতে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে হানজালা বলেছেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সনদ নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন হলো, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও তৈরি করা হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেট ইস্যু করেন। মুক্তিযোদ্ধারা তা অর্জনও করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা যদি মুক্তিযোদ্ধা হতেন তাহলে অবশ্যই তখনকার তালিকায় তার নাম উঠতো এবং তা লাল মুক্তিবার্তায় ছাপা হতো। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেটও পেতেন।
গেজেটভুক্তি সম্পর্কে দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা বলেছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২২ জুলাই, ২০১৩। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে ৪টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিটি ইস্যু হয়েছে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর। দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার বক্তব্য অনুযায়ীই, ওই চিঠি ইস্যু হওয়ার সময় পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুক্তিবার্তায়ও দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার নাম ছিল না। পরবর্তীতে তদবির করে, অর্থ খরচ করে গেজেটে নাম তুলেছেন এবং এখন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছেন। ওয়েবসাইটের এই তালিকার মধ্যে লেখা হয়েছে, ‘লাল মুক্তিবার্তা’। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের লেখা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, ‘লাল মুক্তিবার্তা’ বলতে শুধুমাত্র সেগুলোকেই বোঝায় যা ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।
বস্তুত দেখা যাচ্ছে, সরকার কর্তৃক ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে চাকরির বয়স বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার সময় পর্যন্ত দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনও প্রমাণপত্র বা কাগজপত্র ছিল না। কেউ কোনো দিন এমন কথা শুনেনও নাই। বরং এলাকায় এবং চাকরিক্ষেত্রে তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি হিসেবেই সবাই জানতো।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ৪ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)