মঙ্গলবার, ১৯-ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • নির্বাচন নিয়ে টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে তোলপাড়

নির্বাচন নিয়ে টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে তোলপাড়

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৭:৫২ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা গেলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। ১৫ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। 
প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রার্থীদের সমান সুযোগ না দেয়াসহ বিভিন্ন ত্রুটির কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত’ বলে টিআইবির প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয় ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত-পক্ষপাতদুষ্ট, ইসির ভূমিকা ছিল লজ্জাজনক। সংস্থাটি আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ৬ সুপারিশ তুলে ধরে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মতে, এ ধরনের নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা গেলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ বলা যায় না। বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে বলা হয়, ৫০ আসনের মধ্যে ৪৭ আসনেই ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে রাতেই ৩৩ আসনে ব্যালটে সিল মারা হয়। এই জাতীয় নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। 
যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ ইসি
এই গবেষণার তথ্য তুলে ধরে টিআইবি বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্নক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন, সকল দলের সভা-সমাবেশ করার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, বিরোধীদের দমনে সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার প্রেক্ষিতে অবস্থান নেওয়া, সব দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা, নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে- বিশেষ করে সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ ইত্যাদি। ফলে কার্যতঃ নির্বাচন কমিশন সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। এছাড়া নির্বাচনের সময়ে তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ যেমন-পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; মোবাইলের জন্য ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ; জরুরি ব্যতিত মোটরচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। 
গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল ও জোটের কোনো কোনো কার্যক্রম নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। যেমন-  সংসদ না ভেঙ্গে নির্বাচন করায় সরকারের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী সম্প্রসারণের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনা এবং নির্বাচনমুখী প্রকল্প অনুমোদনসহ নির্বাচনের প্রায় একবছর আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণা; বিরোধী পক্ষের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া; সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দেওয়ার পরও নির্বাচনের সময় পর্যন্ত ধরপাকড় ও গ্রেফতার অব্যাহত রাখা এবং সরকারবিরোধী দলের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা প্রদানসহ প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও সহিংসতা নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে।
টিআইবি বলছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো আসনেই নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা  এককভাবে সক্রিয় ছিল। কোন কোন আসনে ক্ষমতাসীন দল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি প্রচারণার জন্য সুবিধা আদায়সহ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক প্রার্থীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচারণার দৃশ্যও দেখা যায়। অন্যদিকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধীদলের প্রচারে বাধা দানসহ ৪৪টি আসনে সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীদের নামে মামলা, পুলিশ বা প্রশাসন কর্তৃক হুমকি ও হয়রানি, প্রার্থী ও নেতা-কর্মী গ্রেফতার এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও কর্মী কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ভয়-ভীতি দেখানোর তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৯টি আসনে সহিংসতাসহ প্রার্থীদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারি, সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতা-কর্মীদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা, পুড়িয়ে দেওয়ার চিত্র দেখা যায়। 
পাঁচগুণ সীমা ছাড়িয়েছে নির্বাচনী ব্যয়, সবচেয়ে বেশি আ.লীগের
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিকভাবে তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রার্থীদের গড় ব্যয় ৭৭,৬৫,০৮৫ টাকা, যা নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্ধারিত ব্যয়সীমার (আসনপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা) তিনগুণেরও বেশি। প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা (গড়ে পাঁচগুণের বেশি) এবং সবচেয়ে কম ব্যয় করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। 
৫০ আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল
গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি বলছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৭টি আসনে নির্বাচনের দিনেও কোনো না কোনো নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। অনিয়মের ধরনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টির মধ্যে ৪১টি আসনে জাল ভোট; ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা; ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল; ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা; ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট; ২৬টি আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা; ২০টিতে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা; ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া; ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া ইত্যাদি।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এবারের নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসনের একাংশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে, যেটি আইনের লঙ্ঘন এবং নীতিবিবর্জিত। সর্বোপরি আংশিকভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। কারণ একদিকে সকল রাজনৈতিক দল প্রার্থীতার মাপকাঠিতে নির্বাচনে ছিল, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয়তার বিবেচনায় বৈষম্য প্রকট ছিল। তাছাড়া অনেকক্ষেত্রে ভোটারগণ অবাধে ভোট দিতে পারেন নি। আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অবশ্যই ব্যাপকভাবে লজ্জাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকাও ছিল বিতর্কিত। আর এসব কারণেই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ এবং বলা যায়, অভূতপূর্ব একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; যার ফলাফলও অনেকের কাছেই অবিশ^াস্য হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তাই আমরা সরকারের নৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য এবং সরকারের আত্মবিশ^াস বৃদ্ধির জন্য যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাই।” 
১৫ জানুয়ারি এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, “যেভাবে এবারের নির্বাচনটা পরিচালিত হয়েছে তাতে প্রচুর ত্রুটি ছিল। তাই আমরা আশা করবো নির্বাচন কমিশন এই ত্রুটিগুলো দেখে, এই ত্রুটিগুলোর সত্যাসত্য বিচার করে পরবর্তী যে নির্বাচনগুলো হবে সেগুলোতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না হয় সে চেষ্টাই করবেন। কারণ আমরা দেখতে চাই, সত্যিকার অর্থেই জনগণের পছন্দের মানুষেরাই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছেন।” সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, “এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এই উদাহরণ রেখে যায় যে, যদি নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকে তাহলে নির্বাচনটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, বিতর্কিত হয়ে যায়। আর তখন একটা সংশয় থেকেই যায় যে, যারা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে গেলেন, তারা আমাদের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করবেন, জনগণের স্বার্থ কতখানি দেখবেন।” 
টিআইবি’র ৬ দফা সুপারিশ
নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কার্যকর করতে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র পক্ষ থেকে ৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এসব সুপারিশে সংস্থাটি বলছে- একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুমুখী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগসমূহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে কমিশনের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে; নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে; দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য অংশীজনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হতে হবে; নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ডিজিটালাইজ করতে হবে এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণ-মাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের জন্য অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। 
 যে প্রক্রিয়ায় টিআইবির গবেষণা 
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল/ জোট ও প্রার্থী, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন অংশীজন নির্বাচনী প্রক্রিয়া কতটুকু আইনানুগভাবে অনুসরণ করেছেন তা পর্যালোচনা করার পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ প্রাক্কলন করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রধান অংশীজনদের ভূমিকা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার জন্য নভেম্বর ২০১৮ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। তবে তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে শুরু করে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রাথমিক প্রতিবেদনটি প্রণীত হয়েছে। পরবর্তীতে নির্বাচন পরবর্তী প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। 
গবেষণার জন্য দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০০টি আসন থেকে ৫০টি আসন নির্দিষ্ট করে প্রত্যেক আসনে স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান দুটি দল বা জোটের প্রার্থী বাছাই করে প্রার্থী ও তাদের কার্যক্রমের ওপর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো আসনে তৃতীয় কোনো শক্তিশালী প্রার্থী থাকলে তাকেও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১০৭ জন প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যক্রমের ওপর পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্বাচনী পরিবেশ, তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নের আবেদন গ্রহণ ও চূড়ান্তকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা, প্রার্থীদের প্রচারণাসহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুণবাচক গবেষণা পদ্ধতিসহ ক্ষেত্রবিশেষে সংখ্যাবাচক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। 
গবেষণার জন্য প্রত্যক্ষ তথ্যের উৎস হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, দলীয় নেতা-কর্মী, রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিক ও ভোটারদের সাক্ষাৎকার ও পর্যবেক্ষণ গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরোক্ষ তথ্যের জন্য নির্বাচন সংক্রান্ত আইন ও বিধি, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন, ওয়েবসাইট ও সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ পর্যালোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় উপস্থাপিত পর্যবেক্ষণসমূহ সকল রাজনৈতিক দল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক সমাজ ও সংগঠন, ভোটার এবং সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তবে, এ গবেষণা নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি ধারণা প্রদান করে।
টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান ইসির
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যায়িত করে টিআইবি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ‘ওই প্রতিবেদন ভিত্তিহীন। আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছি। পত্রপত্রিকায় এ ধরনের কোনও অনিয়মের তথ্য দেখা যায়নি।’
আপনারা কেবল পত্রপত্রিকার ওপর নির্ভর করেছেন কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে আমাদের কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এনকোয়ারি কমিটিসহ সবার কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি। এ ধরনের অভিযোগের কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।’
টিআইবি বলেছে- নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল লজ্জাকর এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘অসৌজন্যমূলক মন্তব্য। এ ধরনের মন্তব্য করা ঠিক হয়নি।’
টিআইবির প্রতিবেদন উদ্দেশ্য প্রণোদিত: তথ্যমন্ত্রী 
নির্বাচন নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, এ প্রতিবেদন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও একপেশে। এতে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্য প্রতিফলিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে টিআইবি প্রতিবেদনটি দিয়েছে মাত্র। অন্য কিছু নয়। ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, টিআইবি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং পরাজিত পক্ষকে কথা বলার সুযোগ করে দিতে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে। এর সঙ্গে বিএনপির দেয়া বক্তব্যের কোনো পার্থক্য নেই। তিনি বলেন, দেশে এমন কয়েকটি সংগঠন আছে যেগুলোর কাজ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা নয়, বরং তারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার কাজে লিপ্ত থাকে। টিআইবি বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে এটা তাদের গবেষণাপ্রসূত প্রতিবেদন। কিন্তু আমরা অতীতেও দেখেছি, তারা যে গবেষণার কথা বলে, সে গবেষণা প্রকৃতপক্ষে কোনো গবেষণা নয়। বেশির ভাগ প্রতিবেদন হল ত্রুটিপূর্ণ, একপেশে এমনকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পদ্মা সেতু নিয়ে টিআইবি মনগড়া কল্পকাহিনী সাজিয়েছিল। সংগঠনটি দেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পদ্মা সেতুতে যে কোনো দুর্নীতি হয়নি, সেটি শুধু দেশে নয়, বিদেশেও প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক কানাডার আদালতে মামলা করেছিল। সেই মামলায় বিশ্বব্যাংক হেরে গেছে। এরপর টিআইবিসহ যেসব সংস্থা পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির কল্পকাহিনী সাজিয়েছিল, তাদের উচিত ছিল জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া। এ ধরনের মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত থাকা। যেটি তারা করেনি। 
দেশে-বিদেশে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে এসেছিলেন, তারা সবাই এই নির্বাচনের প্রশংসা করেছেন। সম্প্রতি দেশে যত সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হয়েছে। এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানরা বিজয়ী দল, বিজয়ী জোট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তার সঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এমনকি পাকিস্তানও অভিনন্দন জানিয়েছে।
ড. হাছান মাহমুদ বলেন, নির্বাচন অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হলেও প্রচারণা থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। এ নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদনে কোনো বক্তব্য নেই। এ নির্বাচন যে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হয়েছে, সেই বিষয়টিও টিআইবির প্রতিবেদনে নেই। এগুলোয় স্পষ্ট, পরাজিত পক্ষকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া ছাড়া এটা অন্য কিছু নয়।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১২টি নির্বাচনী এলাকার ১৬টি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্থগিত কেন্দ্রগুলোয় নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী সাত্তার উকিল জয়লাভ করেছেন। আওয়ামী লীগের বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর সুষ্ঠু নির্বাচনে সাত্তার উকিল জয়লাভ করেছেন- এ বিষয়ও টিআইবির প্রতিবেদনে নেই। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না করে বরং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে কাজ করতে আমি টিআইবিকে অনুরোধ জানাব। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে।
কী বলছে বিএনপি?
নির্বাচন নিয়ে টিআইবি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আঁতে ঘা লেগেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, টিআইবির প্রতিবেদনে মহা সত্য প্রকাশ হয়েছে। ১৭ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রিজভী। তিনি বলেন, সরকারের সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণের ঘন অন্ধকার ভেদ করে টিআইবি প্রতিবেদনে ভোট ডাকাতির মহাসত্য প্রকাশ হওয়াতে সরকারের মন্ত্রীরা ও নির্বাচন কমিশন মুখ লুকাতে পারছে না। সেজন্য আর্তচিৎকার করে সত্য লুকানোর চেষ্টা করলেও কোন লাভ নেই। মানুষ যা জানার নির্বাচনের আগের দিন রাত থেকেই জেনেছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচনে মহাভোট ডাকাতি নিয়ে প্রতিবেদন, মন্তব্য ইত্যাদি করেছে। বিশে^র নানা গণতান্ত্রিক দেশ বলেছে-এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। তারা এই ভুয়া ভোটের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং তদন্ত দাবি করেছে। বিশ^বাসী এই নির্বাচনকে ইতিহাসের নিকৃষ্ট নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছে। 
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
নির্বাচন নিয়ে টিআইবি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, এটি সঠিক হলে তা দেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক নয়। এতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা কমেছে। ফলে দেশের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।  টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন দেশের সংবিধান ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গবেষণার তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুতর ও উদ্বেগজনক। আর সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন হয়, এমন কিছু করতে পারেনি বর্তমান ইসি। যদিও টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, টিআইবির প্রতিবেদনে যেসব তথ্য এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর এবং উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন সত্য হলে, তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক নয়। তার মতে, নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে। এটি কোনোভাবেই তুচ্ছ করা যাবে না।
সুজন সম্পাদক বলেন, কমিশনকে আইনে অনেক ক্ষমতা দেয়া আছে। ফলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের অবশ্যই এসব বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। সবকিছু মিলে গণতন্ত্রের ভালো কিছু হয়নি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিআইবি একটি আন্তর্জাতিক এনজিও। তারা মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করেছে। এখানে অনেক অনিয়মের কথা বলেছে। আর এ ধরনের সংস্থার গবেষণা বিশ্বাসযোগ্য হয়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে টিআইবির প্রতিবেদনে যা এসেছে, তা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য খারাপ সংবাদ। আর টিআইবি বিস্তারিত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ দিয়ে একটি তদন্ত চাইতে পারে। তবে প্রশ্ন হল- তদন্ত কে করবে। ইসি নির্বাচনের আয়োজন করেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠান দিয়ে তদন্ত সম্ভব নয়। কারণ নির্বাচন কমিশন বলে দিয়েছে, এবারের নির্বাচন সুুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আর সরকারি দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছে। তাদের মাধ্যমেও তদন্ত সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বিচার বিভাগই একমাত্র তদন্ত করতে পারে। আর কোনো সংস্থা দিয়ে তদন্ত সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে যারা টিআইবির প্রতিবেদন মানেনি, তাদেরও তথ্যপ্রমাণ দিয়ে, নিজেদের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন নির্বাচনের সুষ্ঠুতাকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে গত দু’বছরে জাতীয় ও স্থানীয় যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ নির্বাচন কমিশন খুব ভালো কিছু করতে পারবে, মানুষের মধ্যে সেই আস্থা জন্ম হয়নি। ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)