বুধবার, ২৪-এপ্রিল ২০১৯, ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বেনাপোলে শ’ শ’ কোটি টাকার শুল্ক চুরি

কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বেনাপোলে শ’ শ’ কোটি টাকার শুল্ক চুরি

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৬ মার্চ, ২০১৯ ০৪:১৮ অপরাহ্ন

মেহেদী হাসান, বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে শুল্ক চুরির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই বেনাপোল থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য পার হয়ে যাচ্ছে। আর এই শুল্ক চুরিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন কিছু দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তা। শুল্ক চুরির সাথে কাস্টমের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত থাকায় বন্দরে শুল্ক চুরির শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর এ কারণে সরকার কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্রমতে, শুল্ক কর্তৃপক্ষ ছোট কিছু পণ্যের চালান আটক করলেও জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দিচ্ছে। আর বড় কোনো শুল্ক ফাঁকির চালান আটকে তাদের সফলতা নেই। মাঝে মধ্যে বিজিবি কিছু পণ্যের চালান আটক করলে হইচই হয়। পরে আবার তা ঠিক হয়ে যায়। সম্প্রতি কাস্টমসের অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বেনাপোল বন্দরের অর্ধকোটি টাকা শুল্ক চুরির ঘটনা ঘটেছে। বেনাপোল বন্দরের এক শ্রেণির শুল্ক চোর কাস্টমস কর্মকর্তার সহযোগিতায় অনেক আমদানিকারক বছরে শত শত কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেন বলে বেনাপোলে নানা গুঞ্জন রয়েছে। শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় অনেক লাইসেন্স স্থগিত হয়েছে। কিন্তু একই চক্র একটি লাইসেন্স স্থগিত হলে অন্য নতুন নতুন লাইসেন্সে মাল আমদানি করছে, শুল্ক চুরি করছে। যেহেতু এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তারা, তাই শুল্ক চুরিতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। 
জানা গেছে, গত সপ্তায় যশোর-৪৯ বিজিবির হাতে কাস্টমস পেরিয়ে যাওয়া পণ্যের একটি চালান ধরা পড়েছে। ওই পণ্যের বিপরীতে অন্তত অর্ধকোটি টাকার শুল্ক না দিয়েই চালান খালাস করা হয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে বিজিবির কাছে যে চালান ধরা পড়েছে তার সত্যতা মিললে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও যেসব অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা শুল্কের টাকা পকেটে নিয়ে সরকারকে ফাঁকি দিয়েছে সেই ‘চোর’ কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে ব্যাপারে কোনো বক্তব্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি যশোরের নতুন হাট থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রাক আটক করা হয়। এই ট্রাকে প্রায় তিন কোটি টাকার শাড়ি কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য ছিল। এই পণ্য আমদানিকারক বেনাপোলের স্নেহা এন্টারপ্রাইজ। গত ৩ মার্চ ভারত থেকে এই পণ্য বেনাপোলে আমদানি করা হয়। এই পণ্য চালানটি শুল্কায়ন করে বেনাপোলের আরবি এন্টারপ্রাইজ। 
সূত্র জানায়, এই পণ্য চালানটির যে শুল্কায়ন হয় সেই শুল্কায়ন না করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সাথে গোপন চুক্তিতে পণ্য চালানটি বের করে আনা হয়। এদিকে গত ১২ মার্চ বিজিবি আরো একটি কাভার্ডভ্যান আটক করে। বিজিবি জানায় এই কাভার্ডভ্যানেও তিন কোটি টাকার পণ্য রয়েছে। এতে শাড়ি, ৪০০ কেজি চন্দন কাঠ ও এক হাজার কেজি তেতুলের বিচির গুড়া রয়েছে। বেনাপোলের জেড এস এম এন্টারপ্রাইজ এই মালের আমদানিকারক। বিজিবির দাবি, পণ্য চালানটি খালাসে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রায় একই সময়ে বিজিবির হাতে ধরা পড়া বড় এ দুটি চালানের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বলা হচ্ছে, তদন্তে নেমেছেন যশোরের শুল্ক গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন বলেও জানান। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে তারা মুখ খুলতে চাইছেন না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৎ ও নিরীহ একজন কাস্টমস কর্মকর্তা শীর্ষকাগজের এ প্রতিবেদককে বলেন, মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে শুল্ক চুরির ঘটনা ঘটেছে। তার জানামতে, বেনাপোলে এ ধরনের শুল্ক চুরির ঘটনা ঘটলেও দেখার কেউ নেই। তার সহকর্মীরাই এসবের সঙ্গে জড়িত বলে জানান তিনি। শুল্ক চুরি করে কাস্টমস কর্মকর্তারা যেমন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তেমনি স্নেহা এন্টারপ্রাইজ, জেডএসএম এন্টারপ্রাইজের মতো আরো দুর্নীতিবাজ আমদানিকারকরা রাতারাতি হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্নেহা এন্টারপ্রাইজ এর আগে একাধিকবার শুল্ক চুরিতে হাতেনাতে ধরা পড়লেও বেনাপোল কাস্টমস এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। যে কারণে দিনে দিনে শুল্ক চুরিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে স্নেহা এন্টারপ্রাইজসহ দুর্নীতিবাজ আমদানিকারকরা। তাদের এই বেপরোয়া দুর্নীতির সহযোগী বেনাপোল কাস্টমসের দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণির শীর্ষ কর্মকর্তা।
এদিকে শুল্ক চুরির ঘটনা হাতেনাতে ধরা পড়ার পর এটিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য কাস্টমস কর্মকর্তারা ভিন্ন কৌশল ধরেছেন। তারা বেনাপোল চেকপোস্টে কাস্টমস তল্লাশি কেন্দ্রে সাধারণ পাসপোর্টযাত্রীদের ব্যাপকভাবে হয়রানি শুরু করেছেন। চিকিৎসা এবং তীর্থস্থান ভ্রমণের জন্য যাওয়া যাত্রীদেরও চরমভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হয়রানির মাধ্যমে এদের কাছ থেকেও ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। তল্লাশি কেন্দ্রের স্ক্যানিং মেশিন থেকে ব্যাগ বের হওয়ার পর পাসপোর্টযাত্রীদের ব্যাগ টানাটানি শুরু হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতিটি যাত্রীকে অহেতুক হয়রানি করে এ টাকা আদায় করে কাস্টমসের সংঘবদ্ধ চক্র। তবে সাধারণ যাত্রীরা এভাবে চরম হয়রানির শিকার হলেও সংঘবদ্ধ লাগেজ ব্যবসায়ীরা অবৈধ মালামাল নিয়ে ঠিকই দেদারছে পার পেয়ে যাচ্ছে। যারা লাগেজ ব্যবসা করে তাদের সাথে রয়েছে দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশ। এসব অপকর্ম যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য কাস্টমস এলাকায় সাংবাদিক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন একজন ডেপুটি কমিশনার। ওই ডেপুটি কমিশনার এ ব্যাপারে তার ‘বস’ কমিশনারের দোহাই দিচ্ছেন।
বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেছেন, ভারত থেকে অবৈধ আমদানির সাথে শুধু আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ জড়িত নয়, এদের সাথে জড়িত রয়েছে কাস্টমস ও বন্দরেরর বড় বড় কর্মকর্তা কর্মচারীরা। মাঝে মধ্যে দেখা যায় চোরাইপণ্য আটক হলে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অথচ এর সহোযোগী কাস্টমস ও বন্দরের কর্মকর্তারা থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। 
যদিও কাস্টমস কর্মকর্তারা দাবি করছেন, একটি সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা এসব কর্মকা- চালালেও শুল্ক ফাঁকি রোধে কাস্টমস ইতিমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কাস্টমসের কেউ অপরাধের সাথে জড়িত হলে তার কোন রকম ছাড় নেই। কিন্তু তাদের এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 
মূলত, কাস্টমসের সহযোগিতা ছাড়া শুল্ক চুরি মোটেই সম্ভব নয়। অথচ, ঘটনা ধরা পড়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানিকারক বা অন্যদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও কাস্টমস কর্মকর্তারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তের নামে পুরো ঘটনাটিকেই ধামাচাপা দেয়া হয়।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৫মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত)