শনিবার, ১৮-আগস্ট ২০১৮, ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন

নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ মে, ২০১৮ ০২:১৪ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা: ভারতের কেরালায় নতুন কোরে আরও বেশ কয়েকজনের দেহে প্রাণঘাতী নিপা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হলেও, প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গেল কয়েকদিনে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১শ' ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ। এদের মধ্যে অন্তত ৯০ জন প্রাথমিক চিকিৎসায় আশঙ্কামুক্ত হলেও, এখনও গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন অন্তত ১০ জন। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে কেরালায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল পাঠানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
 
জানা গেছে, স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য কেরালার সাধারণ মানুষেরা। উদ্দেশ্য নিজেদের নিপা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত রাখা। এলাকাটিতে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটির প্রাদুভাব দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই এক সেবিকাসহ অন্তত ১০ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দিয়েছেন। চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও অনেকে।

তবে নতুন করে আরও অনেকের দেহে এ ভাইরাস সনাক্ত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চিকিৎসকরা। গাছের নিচে পড়ে থাকা ফল না খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

তিরুবনন্তপুর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক আনেশ টিএস বলেন, '১৮ জনের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি, এর মধ্যে ১২ জনের দেহেই এ ভাইরাসের জীবানু পাওয়া গেছে। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি, কারও জ্বর হলেই তাকে দ্রুত নিবিড় পর্যবেক্ষণে নিয়ে আসা হচ্ছে।'

বাদুর, শুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর দ্বারা ছড়ানো এ ভাইরাসের লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট, জ্বর, মাথাব্যথা, বিভ্রান্তভাব ও প্রলাপ বকা। যা সংক্রমণের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রোগী গভীর কোমায় চলে যেতে পারে। তবে মহামারী এই ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য ও পরিবারবিষয়ক মন্ত্রী অশ্বিনী কুমার চৌবী।

অশ্বিনী কুমার চৌবী বলেন, 'ভাইরাসটি প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে সেখানে জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ সেন্টারের একটি দলকে পাঠানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে আক্রান্ত মানুষদের সঠিক দিক-নির্দেশনা দিবেন।'

১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়াতে প্রথম এ ভাইরাসটি সনাক্ত করা হয়। এছাড়াও ২০০৪ সালে বাংলাদেশেও বাদুরের মাধ্যমে সংক্রমিত খেজুরের রস খেয়ে অনেকে এ রোগটিতে আক্রান্ত হন। হতাশার বিষয়- এ পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের কোনো টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে আক্রান্তদের ৭০ শতাংশেরই মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ভারতে নিপা আতঙ্ক
ভারতের কেরলে নিপা ভাইরাসের প্রকোপে ১০ জনের বেশি লোকের  মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে কেরল তথা সারা ভারত জুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এই মারণ ভাইরাস ( নিপা ভাইরাস)। যদিও কেরলে অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ভাইরাস।

আনন্দবাজারের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী,  ভাইরোলজির  অধ্যাপকেরা জানিয়ে দিয়েছেন,  নিপা ভাইরাস যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন, সে মোটের উপর এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে৷ যদিও কেরলে এই ভাইরাস নবাগত। কিন্তু  ২০০১ সালে দেশটিতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে  থাবা বসিয়েছিল এই ভাইরাস। সেখানে আক্রান্ত হন ৬৬ জন এবং তাদের মধ্যে ৪৫ জনের মৃত্যুও হয়। যদিও শিলিগুড়িতে এই  মৃত্যুর কারণ তখন জানা যায়নি।

পরে গবেষণায় জানা গিয়েছিল এই “মারণ জ্বর”-এর  কারণ ছিল   নিপা ভাইরাস। এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশে এই রোগে ৫৬ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ৫০ জনের। হু -এর (World Health Organization) রিপোর্ট অনুসারে, এখন পর্যন্ত নিপার প্রভাবে ৪৭৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৫২ জনের।

আসলে কী এই নিপা ভাইরাস?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO এর মতে নিপা ভাইরাস (NiV) সংক্রমণ এক নতুন ধরনের zoonosis  প্রকৃতির ভাইরাস সংক্রমণ  যা  মানব শরীরে নানান গুরুতর  শ্বাসজনিত মারন রোগ থেকে ক্ষতিকর এনসেফাইলাইটিস  রোগের সৃষ্টি করছে । Zoonosis হল এমন ধরনের রোগ  যা পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রামিত হতে পারে।

WHO, এই ভাইরাসের  প্রাথমিক বাহক হিসাবে শুকরকে চিহ্নিত করেছে। তবে  ফল ভক্ষনকারী অনেক পশু-পাখিও এই ভাইরাস বহন করতে পারে। নিপা বা নিভ প্রধানত বাদুর জাতীয় পশুর থেকেই ছড়ায়।  নিপা অপেক্ষাকৃত নতুন ভাইরাস যা অতি সহজেই বাদুর জাতীয় তৃণভোজী প্রাণীর থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। শুধুমাত্র বাদুর নয়, নিপা শূকরের বর্জ থেকেও ছড়ায়।

১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার নিপাতে প্রথম এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়। সেখানে বাড়ির পোষ্য কুকুর, বেড়াল, ঘোড়া, ছাগলের দেহে এই ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ওই অঞ্চলে প্রতিটি বাড়িতেই শূকর প্রতিপালন হয়। গবেষণার পর দেখা যায়, ওই শূকরদের থেকেই নিপার প্রভাব ছড়িয়েছে পোষ্যদের দেহে। এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

অভিজ্ঞ ভাইরোলজির  অধ্যাপকেরা জানিয়েছেন , বাতাসের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমণ সম্ভব নয়। যদি কোন ব্যক্তি এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসে বা এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন পাখির খাওয়া ফল খায়, তখনই এই ভাইরাসের সংক্রমণ সম্ভব।

এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাস আক্রান্ত মানুষ বা পশুর জন্য কোন প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। আর তাই একমাত্র প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে উপযুক্ত চিকিৎসা তত্ত্বাবধানে রোগীদের বাঁচানো সম্ভব।

নিপা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ কী?
চিকিৎসকদের মতে, নিপা ভাইসারের আক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা শতকরা ৭০ শতাংশ।   সাধারণভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে আপনার যেসমস্ত শারীরিহেল্থহেল্কথ অসুস্থতা  দেখা যাবে সেগুলি হল শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা বমি করা,  জ্বর এবং মাথা যন্ত্রণা ও ঝিমুনি। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৩–১৪ দিনের মধ্যে এই উপসর্গ শুরু হয়ে,  যা হেল্থএক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। নিপা ভাইরাসে আক্রান্তদের ,  প্রাথমিক পর্যায়ে  এনকেফেলাইটিসের শিকার হতে হয়।   পরবর্তী পর্যায়ে জ্বর বাড়ে ও সেই সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন রোগী। এরপর ধীরে ধীরে কোমাতে চলে যায় সে। আর এরপর মৃত্যু অনিবার্য।

যদি কোন ব্যক্তির এইসব শারীরিক অসুস্থতা দেখা যাচ্ছে তাহলে তাদের খুব তাড়াতাড়ি ডাক্তারদের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং বাড়াবাড়ি হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাওয়া উচিত। কারণ নিপা ভাইরাস খুব তাড়াতাড়ি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুবই মারণ তার সংক্রমণ। এখনও পর্যন্ত এই রোগ নিরুপায়ের উপায় বাজারে আসেনি। ফলে, এর প্রকোপ সেভাবে আটকানো সম্ভব হয় না।

রোগ নির্ণয়
সাধারণ পরীক্ষায় এ রোগ ধরা পড়ে না৷ থ্রোট সোয়াব, অর্থাৎ গলা থেকে তরল নিয়ে রিয়েল টাইম পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন নামের পরীক্ষা করা হয়৷ শিরদাঁড়ার তরল, ইউরিন ও রক্ত পরীক্ষাও করতে হয়৷ সেরে ওঠার পর রোগটা নিপা ভাইরাস থেকেই হয়েছিল কিনা জানতে আইজিজি ও আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়৷


নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়

চিকিৎসক জয়ন্ত ভট্টাচার্য বলেন, “যেসব ফল আমরা খাই তা গাছে থাকাকালীন অনেক সময়েই বাদুর বা অন্য প্রাণীরা খেয়ে থাকে। ফলে ভাইরাস ওই ফলে থাকতে পারে। তাই ফল ও কাঁচা শাকসবজি না খাওয়াই শ্রেয়। সম্ভব হলে গরম জলে ধুয়ে শাকসবজি রান্না করা উচিত। খেজুর বা গুড় দিয়ে তৈরি খাপার সাময়িক এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়।”  যেহেতু বাদুড় এই ভাইরাসের প্রধান বাহক এবং বাদুড়ের প্রিয় পানিয় খেজুরের রস  তাই দেখা গেছে খেজুরের রস পান করাই এই রোগ সংক্রমণের মুল কারন।

এছাড়া ও এই ভাইরাসে  আক্রান্ত রোগীদের দেহের তরলের মাধ্যমে  এই রোগ  চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত গতিতে। ঠিক এই কারনেই কেরালাতে কর্মরত এক নার্সের প্রান গেছে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করতে গিয়ে।  তাই এই রোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে গেলে রোগীদের সংস্পর্শে একদম আসা যাবে না। আর যদি আসেন তাহলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং জীবাণুনাশক  সাবান বা তরল দিয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে প্রতিবার।

সাবধানতা
অসুস্থ বা রোগগ্রস্ত শূকর, বাদুরের মতো প্রাণী থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভালো। গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ফল না খেলেই ভালো হয়। বিশেষ করে যে ফল পাখি বা বাদুরে খেয়েছে এমন।

শীর্ষনিউজ/এইচএস