সোমবার, ২৫-জুন ২০১৮, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন
  • জাতীয়
  • »
  • যা বললেন বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা

যা বললেন বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ মার্চ, ২০১৮ ০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন

শীর্ষ নিউজ ডেস্ক: নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে গত সোমবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের ৭১ জন আরোহীর মধ্যে যে ক’জন বেঁচে গেছেন তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন। শরীরে আঘাত আর দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালের বিছানায় কাতরানো এসব ব্যক্তি বলছেন, তারা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। অনেকেই চিৎকার করছিল আর দোয়া পড়ছিল। হাসপাতালে তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন তাদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। এদিকে মর্মান্তিক এই বিমান দুর্ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। খবর কাঠমান্ডু পোস্ট, হিমালয়ান টাইসম, বিবিসি ও এএফপির।
নেপালের ১২ জন ট্রাভেল এজেন্সি মালিক বাংলাদেশে এসেছিলেন একটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে তারা ইউএস-বাংলার ওই বিমানে করেই দেশে ফিরেন। তাদের মধ্যে তিনজন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের একজন আশিষ রঞ্জিত। নরভিক ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান’। এ সময় তার স্বজন ও শুভাকাক্সীরা তার বিছানার চার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং কেউ কেউ সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন রঞ্জিত বেঁচে যাওয়ায়। রঞ্জিতের ভাই এ সময় আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, যখন বিমান দুর্ঘটনার খবর শুনি তখন বলতে গেলে আমাদের কোন হুঁশ ছিল না, এখন অনেক ভালো লাগছে।


রঞ্জিত বলেন, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম। কারণ বিমানটি দুলছিল। আমি আতঙ্কিত হয়ে একজন বিমানবালাকে ডাকলাম। কিন্তু আমাকে তার সিটে বসেই আঙুলের সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাকে নির্ভয়ে বসে থাকতে বললেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বিমানের গতি বেড়ে গেল এবং আমি বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। আমার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হলেও আমি সম্বিত ফিরে পেলাম এবং চোখ মেলে তাকালাম। দেখলাম বিমানে আগুন জ্বলছে। লোকজন কান্নাকাটি করছেন এবং কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। আমি দ্রুত আমার সিটবেল্ট খুলে ফেললাম এবং আমার কয়েকজন বন্ধুসহ বিমান থেকে লাফ দিয়ে বাইরে চলে এলাম। এভাবেই আমরা বেঁচে গেছি। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়ই এটা সম্ভব হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা না বাঁচালে অন্যদের সাথে আমিও মারা যেতাম।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের আরেকজন হলেন ২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশী শিক শাহরিন আহমেদ। কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। কান্নাভেজা চোখে শাহরিন সংবাদমাধ্যম বলেন, আমি আমার বন্ধুর সাথে বিমানে ছিলাম। বিমানটি যখন অবতরণ করার সময় এটি বাম দিকে মোড় নিতে শুরু করে। এ সময় যাত্রীরা চিৎকার করতে লাগলেন। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বিমানে আগুন ধরে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বলল তার আগে আগে দৌড়াতে। কিন্তু যখন আমরা দৌড়াতে লাগলাম আগুনের শিখা তাকে ঘিরে ফেলল। ও পড়ে গেল। লোকজন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিল, চিৎকার করছিল আর পড়ে যাচ্ছিল। তিনজন জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়ল। খুব ভয়াবহ ছিল এ দৃশ্য। ভাগ্যক্রমে কেউ একজন আমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসে। শাহরিন বলেন, বাইরে প্রচণ্ড রকমের আগুন ছিল এবং আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এরপর সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়। পরে আগুন নিভিয়ে উদ্ধার করা হয় আমাদের।
চিকিৎসক নাজির খান জানান, শাহরিন ডান পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তার সার্জারি করতে হবে। পিঠও ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।


শাহরীন আহমেদ আরো বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা থেকে আমরা টেক অফ করি। আড়াইটার দিকে কাঠমান্ডু পৌঁছে পাইলট প্রথমে ল্যান্ড করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। পরে ঘুরে ঘুরে আবার যখন দ্বিতীয়বার ল্যান্ড করার চেষ্টা করেন, বাম দিকটা উঁচু হয়ে যায়। তখনি আমি বললাম, বাম দিকটা উঁচু হলো কেন, আর তখনি ক্রাশ হয়ে গেল।
একটি দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, এরকম সতর্কবার্তাও পাইলট, কেবিন ক্রু বা অন্য কেউ দেননি। তারা নিজেরাও কিছু বুঝতে পারেননি। সবাই ভয়ে চিৎকার করছিল আর আল্লাহর কাছে দোয়া পড়ছিল।
এর আগে কি আপনাদের কোনো আভাস দেয়া হয়েছিল? আপনারা কিছু টের পেয়েছিলেন? জবাবে শাহরীন আহমেদ বলেন, একেবারে স্বাভাবিকভাবেই বিমানটি নামছিল। একদম হঠাৎ করে সব কিছু হয়ে গেল। ঘটনার বর্ণনা দেয়ার সময় তিনি কাঁদছিলেন আর বার বার কেঁপে উঠছিলেন।
পেশায় শিক্ষক শাহরীন আহমেদ একজন বন্ধুর সঙ্গে প্রথমবারের মতো নেপাল বেড়াতে এসেছিলেন। কাঠমান্ডু ও পোঁখরায় বেড়ানো শেষে শুক্রবারই তাদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই বন্ধু দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
শাহরীন বলেন, আগুন লাগার প্রায় ২০ মিনিট পর সাহায্য আসে। সে পর্যন্ত আমি ও আরেকজন বিমানের ভেতরেই বসেছিলাম। প্রচণ্ড ভয় লাগছিল আর হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছিলাম। কারণ আমি জানতাম, আগুন লাগার পর অনেকে দম বন্ধ হয়েই মারা যায়। উদ্ধারকারীরা আগুন নেভানোর পর বিমানের একটি অংশ খুলে যায় আর বাইরে থেকে পরিষ্কার বাতাস ভেতরে আসতে শুরু করে। বাইরে আসার সময় তিনি দেখতে পান, আরেকজন কাছেই বিমানের ফোরে পড়ে ছিল, তার হাত ঝুলছিল। তিনি বেঁচে আছেন কি না, শাহরীনের তা জানা নেই।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশী মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে সঙ্গে ছিল। মেহেদি বলেন, আমার সিটটি ছিল বিমানের পেছন দিকে। আগুন দেখেই আমি আমার পরিবারের লোকজনের অবস্থা জানার চেষ্টা করলাম। জানালা ভাঙার চেষ্টা করলাম। আমরা অপোয় রইলাম যে, কেউ আমাদের উদ্ধার করতে আসে কি না। আমি ও আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু আমার কাজিন ও তার মেয়ে নিখোঁজ।
কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড টিচিং হাসপাতালটিতে শাহরীন ও মেহেদিসহ ১২ আহতের চিকিৎসা চলছে। অপর চারজনকে এ হাসপাতালে আনা হলেও পরে তাদেরকে গ্র্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল, নিউরো এবং নেপাল মেডিসিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কেশব পান্ডে নামে আহত এক নেপালি নাগরিক জানান, বিমান দুর্ঘটনার পর আগুন লাগার কথা। কিন্তু কিভাবে বিমান থেকে বের হয়ে এলেন তা মনে করতে পারছেন না তিনি। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর আমি বিমান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। কারণ বিমানটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল, কিন্তু বের হতে পারছিলাম না। আমার হাত-পা আটকে গিয়েছিল। আমি জরুরি বহির্গমন দরজার পাশের একটি সিটে বসেছিলাম। সম্ভবত উদ্ধারকারীরা দরজা খোলার পর আমি বাইরে পড়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আরেক নেপালি সানম শাকিয়া বিধ্বস্ত বিমানের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানান, মাটি স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিমানটিতে কোনো ঝামেলা হচ্ছে বলে তিনি বুঝতে পারেননি। বিমানটি উপর-নিচ, ডান-বাম আবার উপর-নিচ করছিল। সে কারণে আমি ভাবলাম এটি বিমান চলাচলসংক্রান্ত কিছু। কিন্তু বিমানটির যে সমস্যা আছে সেটা কেবল জোরপূর্বক অবতরণের পরই বুঝতে পারলাম।
ওই বিমান দুর্ঘটনায় আহত নেপালি বসন্ত বহরা বর্তমানে থাপাথালিভিত্তিক নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। বসন্ত জানান, ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিক ছিল বিমানটি। কিন্তু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ই সঙ্কট তৈরি হয়।
শীর্ষ নিউজ/জে